এখন তরঙ্গ তে লেখা পাঠান প্রতিমাসের ৫ থেকে ২০ তারিখ অবধি

শর্মিষ্ঠা ব্যানার্জী



কবিতা (সাধারণ বিভাগ)




কোলাজ

সেই আবার ফিরতেই হবে-
বর্ষণসিক্ত পথ বেয়ে,
চোখের জলের নোনা পাতায়।

অভ্যাসেই ধরে রাখে চিরকাল,
ক্ষয়ে যাওয়া অন্তঃসারশূন্য প্রেম,
দু এক আঁচড়ে, কবিতার খাতায়।

কৃষ্ণপক্ষের একান্ত নিবিড় রাতে,
দুচোখের মাঝে আঁকড়ে থাকা চিরঘুম,
জানলার পাশে নষ্ট চাঁদের বেদনায়-
একলা জেগে জোনাকিরা, রাত নিঝুম।

ভুলেছে পথ, অচেনা নাবিক, চেনা বন্দরে,
ঠিকানা হারিয়ে একলাটি উড়ো খামে।
নারীর শরীরে বহমান ভালোবাসায়,
স্মৃতির কোলাজে সাজানো এলবামে।






অনুগল্প



বহুরূপী

সোনাঝুরি হাটে দেখেছিলাম লোকটাকে।রাক্ষসের বিভৎস মুখোশ মুখে। সামনে কালো চাদরে ছড়িয়ে কিছু নোট, খুচরো পয়সা।
মিঠি বহুরূপীটাকে দেখেই আতংকে দৌড়ে মাটিতে আছড়ে একেবারে রক্তারক্তি কান্ড ঘটিয়ে ফেললো। আজই কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে মিঠি আর ওর মাকে নিয়ে দুদিনের ছুটিতে ঘুরতে এসেছি। আর প্রথমদিনেই এই ঘটনায় মাথাটা চড়াৎ করে গরম হয়ে গেলো।
শাল্লা, বাচ্চাদের ভয় দেখিয়ে টাকা রোজগারের ধান্দা না? রেগে লোকটার মুখোশটা একটানে খুলে কাঁধ খামচে ঝাঁকিয়ে দিলাম। মুখোশের নিচে পিচুটি  পড়া করুন নীরব মুখটা চেয়ে রইল শুধুই।


হাট ঘুরে ফিরছি। পিছনে বাবু ডাক শুনে থমকালাম, সেই লোক।
হাতে একটা খেলনা একতারা। বিরক্তি মুখে তাকাতে, বিব্রত মুখে বলল, ঘরে ঠিক খুকির বয়সীই আমার ছেলে আছে বাবু। ক্যান্সারে ভুগছে, গরীব বহুরূপী আমি ভিক্ষা করেই ছেলের চিকিচ্ছের খরচ চালাই। খুকীকে ভয় দেখাতে চাইনি। শুধু ভুল বুঝবেন না বাবু, তাতে আমার ছেলের অভিশাপ লাগবে।
নাও মা,  মিঠির হাতে একতারাটা দিয়ে,  আমাদের হতভম্ব করে একটা গরীব বহুরূপী বাবা হাটের ভিড়ে হাঁটা লাগালো।

সমাপ্ত***

অতনু গঙ্গোপাধ্যায়



ছোট গল্প



এবং বিবর

                        পর্দাটা একটু সরিয়ে দিল নীল। মাথার কাছে পুবমুখো জানলাটা। একফালি রোদ এসে পড়ছে নিতার পিঠে। হলুদ হয়ে যাওয়া পিঠের দিকে মনে হল সরষে ক্ষেত। ও উল্টে দিইয়ে কাছে টেনে আনল নীতাকে। টিকালো নাকের ছোট্ট হীরের নাকছাবিটা ঝিকমিক করে উঠল। চোখ বুজেই নীতা বলে উঠল- উওম্ম, কাছে এসো না। নীল ঠোঁটে ঠোট ডুবিয়ে দেওয়ার আগেই আড়চোখে মোবাইলে টাইম দেখে নিল যে চেক আউটের এখনো তিনঘন্টা বাকি আছে ।
                              
-২-
অফিসে নিজের ঘরে বসে নীতা গত উইক এন্ডের আউটিং-এর আপলোড করা ছবি দেখছিল। সরষে ক্ষেতে সবুজ নীতা,নদীর জেটিতে বসে লাল কুর্তিতে নীতা- প্রায় দুই জিবি মেমোরি ভরপুর নীতা। নানা ভংগিমায়। একটি ছবিকে আলতো আদর করে বল্ল – তুই হবি আমার ফেসবুকের কভার। একটি আদুরে মুখের ছবিকে ঠোনা দিয়ে বল্ল- তুই হবে আমার হোয়াটসএপের ডিপি। নীল যে ছবিগুলিকে এক্সক্লুসিভ পাঠিয়েছে। এই সপ্তাহ জুড়ে হবে স্ট্যাটাস। স্ট্যাটাসের ভারি মজা। চব্বিশ ঘন্টা পরমায়ু। নীল ছবিগুলিকে দেখবে আর হোটেলের আদর সময়কে কল্পনা করবে। কত ভালবাসার গল্প শোনাবে হোয়াটসএপ জুড়ে। নীতা ঘড়ি দেখে বুঝল –এখন নীলের লাঞ্চ টাইম। ও একটা মেসেজ রাখল – lonely feeling honey। নীলের উত্তরবাক্সে লেখা ফুটে উঠলো – Typing…. । নীতা বেরিয়ে এসে আবার ওর ছবি দেখে যাচ্ছে। তখন শাড়ি পড়ে বেরিয়েছিল। বিকালের জেটিপারে লোক নেই। নদীর ধারে অশত্থের গাছের তলায় চায়ের দোকান। নীল ডাকল – চা খাবে ? নীতার আকাশি শাড়ির আঁচল উড়ছিল দামাল হাওয়ায়। অনেকটা দূরে চলে গেছিল ওখান থেকেই চিৎকার করে বল্ল –চলো নদী ডাকছে যদি সূর্য্যাস্ত হয়ে যায়। আগে হেটে আসি। নদীর জলে পা ভিজিয়ে শাড়ীটা গাছকোমর করে বেঁধে ছবি তোলা। একফালি কোঁকড়া চুল ঢেকেছে মুখের একপাশ। নাকছাবিটী উজ্জ্বল দিনশেষের গোধূলি আলোতে। ওরা যখন নদীর পাড় থেকে হোটেলে ফিরছিল অশ্বত্থ গাছটার তলায় ঝুপসি অন্ধকার।
নীতা মেসেজ বক্স খুলে দেখে নীল একটা বড়সড় লাল টুকটুকে হার্টের ছবি পাঠিয়েছে। তার তলায় ফুটনোট – still hang over, baby। একচিলতে হাসি ফুটে উঠল নীতার মুখে। তখনই জিএমের ঘরে কল- আসুন একটু।
-৩ -
সৌর ঘুম থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। এল্যার্ম সকালে বাজার পরও একটু ঘুমাতে গিয়ে বিপত্তি। এই দায়িত্ব পলাতক ঘুমটা অনেকটা আসলের উপর সুদের বিলাসিতার মত। এপার্টমেন্টের পরদা সরাতেই ঘর আলোয় ভরে গেল। এখন বেলা বারোটা। তার মানে মা-বাবার এখন মধ্যরাত। নীতাকে ফোনে ধরল – ঘুমিয়ে পড়েছো নাকি? না তো, তোমার ফোনের অপেক্ষা করছিলাম। কাল রাতে এত দেরিতে এসেছ। মা-বাবা কি ঘুমাচ্ছে? তুমি কাল কি পার্টিতে গেছিলে? আরে না না, অনেক কাজ ছিল। আমাদের সেক্টরে কি পার্টি চলে? চলমান পার্টি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পার্টি হয়ে যায়। আজ যাব একটা প্রোজেক্ট দেখতে। তার রিপোর্ট পাঠাতে হবে। কাল আবার ম্যানহাটান। তুমি কি শুয়ে পড়েছ? নীতা একটা থ্রিলার পড়ছিল। এক টানটান মুহূর্তে গল্পটা। ও সৌরকে বলে দিল – যাক, বউয়ের খেয়াল রাখছ। আমি মাঝরাতে আবার কোথায় যাব? জানালার ধারে এসে সৌর কথা বলছিল। রাস্তার ওপারে ডিপার্ট্মেন্টাল স্টোরের
বাইরে সোনালি চুলের একটি মেয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে । ওর হটপ্যান্টের বাইরে রোদে ঝলসানো ক্রাশড উরু দেখতে দেখতে নীতাকে বল্ল- I will be the top, top and top। তুমি তো জানো, আমার কাজটা কেমন ? একটা বছরের মধ্যেই ত দেশে ফিরব। দোন্ট ওরি, বেবী। তুমি আমার একমাত্র সুইটহার্ট। মোবাইল সংযোগটা যে কিছু আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ও নামিয়ে রাখার আগে বুঝল। যাই হোক সৌরের হাতে সময় নেই। কোম্পানীর গাড়ি এখুনি চলে আসবে। ওর একটু  ভালভাবে গোসল করা দরকার। কাল রাতে মার্গারিটার ফ্ল্যাটে ডোজটা একটু বেশিই হয়ে গেছে । মাথার ভারটা কাটানো দরকার বরং বাথটাবে শুয়ে ব্যালান্স শিটটা মেলানো যাক। এটা সৌরের প্রিয় খেলা। সিঁড়ির ধাপ গোনা অংক।

-৪-
সপ্তাহের আজ বৃহস্পতিবার। আবার একটা উইকএন্ড চলে এল। অফিস, শ্বশুরবাড়ি সারাদিনের কত ঝক্কি। গোটা সপ্তাহ একেবারে নিংড়ে নিয়েছে। আজ অফিস শেষে একবার মাকে দেখতে যাবে নীতা। কাল গ্রুপের সারাদিন সবার সাথে যোগাযোগ হয়নি। দামী এন্ড্রয়েডটা হ্যাং করে গেছে। আজ বিকেলে দেবে। ওটা ছাড়া ওর একমুহূর্ত চলে না। কতগুলি গ্রুপ। সারাদিন মেসেজ আর ছবি চালাচালি হচ্ছে। এর মধ্যে কিটি গ্রুপের বন্ধুদের ডুয়ার্স যাওয়ার প্ল্যান চলছে ছুটিতে। সোমবার ছুটি পরে যাওয়ায় পর পর দুদিন কে আর বোর হয়?  নীলের সাথে যোগাযোগ নেই মঙ্গলবার থেকেই । এর মধ্যে ফোন চলে এল সেঁজুতির। সবে স্নানে যাবে। হাই নীতা,কী করছিস ? আর বলিস না, বোর আর বোর। সারাদিন অফিস আর বাড়ি –নীতা আয়নায় মুখ দেখতে বলে।
শোন, সোমবার তো ছুটি, শান্তিনিকেতনে যাবি নাকি ?- ওপার থেকে বলে সেঁজুতি।  
না রে, আমার বোধহয় যাওয়া হবে না – নীতা অন্যমনস্ক হয়ে কানের দুলটা  ঠিক করতে করতে বলে।
-যাবি তো চল। একটা সারপ্রাইজ আছে  
-কীরকম ?
-আমার এড এজেন্সীর এক মস্ত ক্লায়েন্ট বুঝলি। আমি তো জানতামই না। -সেঁজুতি উত্তেজিত কল কল করে ওঠে– আমার সংগে নবনালন্দায় একস্ংগেই পড়েছে। তারপর একদিন ওর অফিসে কাজে গেছি। কথায় কথায় সব পুরানো কথা উঠে এল।
ইন ফ্যাক্ট, ওই আমাকে ক্লাস সেভেনে প্রথম লাভলেটার দেয় । কিন্তু দ্যাখ, এখনো মনে আছে বিচ্ছুটার। আমি ভুলেই গেছিলাম। তারপর থেকে আবার কি নম্বর এক্সচেঞ্জ। চলছে বাক্যালাপ – সেঁজুতি এক নিঃশ্বাসে বলে যায়।
-আরে থাম থাম। একটু জল খেয়ে নে তারপর বল। ডেটিং চলছে নাকি ?
- একদিন বেড়িয়েছিলাম ডিনার করতে তবে ব্যাটা খুব উঠছে রে। শালা বিএমডব্লু চড়ে এসেছিল। প্রস্তাবটা ওরই। শুক্রবার সন্ধ্যায় যাব গাড়ি নিয়ে। সোনাঝুড়ি হাটের ওখানে থাকব। সংগে এক ফটোগ্রাফার বন্ধুও যাচ্ছে। খুব হ্যান্ডসাম। আমি কিন্তু বলে দিয়েছি আমার এক বন্ধুও যাবে। চল। চল। ।
-আচ্ছা দাঁড়া, তোকে বিকেলে জানাচ্ছি তবে স্কচ, হুইস্কি কিন্তু একেবারেই চলবে না। লাস্ট ইয়ার সারা সন্ধ্যা কোপাইয়ের ধারে তোর হুইস্কি কিক খেয়ে পরদিন উঠতেই পারিনি ।             

                          - ৫ -
ট্যাবের গোটা স্ক্রীন জুড়ে পর্ণো নায়িকা তখন আস্ত কলাটা গোটা মুখে ঘসছে আর নীল রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর বাড়ির সোফা সেটে মিউট করে দেখে যাচ্ছে। বিন্দু বিন্দু ঘামতেল লোমকূপের আড়াল থেকে আসছে আর ঠোঁটের স্ফুরণে হানি হানি মাখো মাখো উল্লাস । নীল মন দিয়ে দেখছিল। পাশের ঘরে মা আর পিসী টিভি দেখছে। খাওয়া-দাওয়ার পরও বসেছিল কারণ মা-র কি নাকি জরুরি কথা আছে। বসে থাকল কিছুক্ষন ওদিকে মা আর পিসীতো সিরিয়ালে মজেই আছে। তারপর ওর ঘরে এসে মোবাইলটা খুলেছে কাজের বসার আগে মাথাটা একটু হাল্কা করে নেওয়া দরকার। এদিকে কোম্পানী আবার টার্গেট ধরিয়ে দিয়েছে এবছর টার্নওভার বাড়াতে হবে আর শেয়ার পলিসি নিয়ে ম্যানেজিং বোর্ডের সম্ভবত কিছু সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হবে। কাজ আজকাল অফিসেও শেষ হচ্ছে না। বাড়িতেও নিয়ে আসতে হচ্ছে। একটু পরেই ল্যাপটপে মেলগুলি চেক করে রিপ্লাই দেওয়া, কিছু মেল করে কাজের নির্দেশ দেওয়া। কাজ পিছু ছাড়ছে না। তবে নীলের একটা আনন্দের খবর আছে। সামনের সপ্তাহে নন্দিতা আসছে ইউকে থেকে। ওর এশিয়ান স্টাডিজের গবেষনার বিষয়টা খুব মজার – রোল অফ দ্য ফ্যামিলি ইন ইন্ডিয়ান সোসাইটি। কতদিন নন্দিতার সাথে দেখা হয় না। ও রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে বেরিয়ে তারপর ওর মেসের কাছে এলেই দারোয়ান নন্দিতাকে ডেকে দিত। তারপর দুজনার কত গল্প, ঘুরে বেড়ানো। আজ দুপুরে নন্দিতাকে ফোনে কথা হল। অনেক পুরানো কথার পর নন্দিতা জানাল – ও কিচ্ছুক্ষনের জন্য কলকাতায় থাকবে। নীল যেন ওকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করে তারপরে একসংগে লাঞ্চ সেরে কিছুক্ষন একসঙ্গে কাটিয়ে রাতে ও আবার বাংলাদেশের ফ্লাইট ধরবে।

-৬-
নীল যখন কাজ শেষ করে উঠে টয়লেটে গেল তখন শুনশান মাঝরাত। ওর মনে হল এখন একটু ঘুম দরকার। আজ তো শনিবার। সন্ধ্যায় গাড়িটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লে হয়। ও হোয়াটসএপে দেখে নীতা অনলাইন হয়ে আছে। ও একটা ম্যাসেজ ছাড়ল- হাই বেবি, হোয়াটস অন টুডে? উইল ইউ জয়েন? টুপ করে অনলাইন লেখাটি চোখ বুঁজে অফলাইন হয়ে গেল আর ম্যাসাজে একটা মাত্র টিক । নীল তাকিয়েই আছে এখনো ।

অতনু গঙ্গোপাধ্যায়

Puratan Collegehostelpara
Chakbhabani,P.o - Balurghat
Dakshin Dinajpur
pin-733101
mbl.no. 7908613735


রিয়া ভট্টাচার্য



ছোটগল্প


ছিন্নপত্রাভাস


--"এতোদিন কিছু একা থেকে শুধু খেলেছি একাই,
পরাজিত প্রেম তনুর তিমিরে হেনেছে আঘাত
পারিজাত হীন কঠিন পাথরে।....."


তালসারির নির্জন সৈকতে বসে চোখ বুজে একমনে আবৃত্তি করে চলেছে রিমি। গোশাবকের ক্ষুরস্থ ধূলিকণাকে সাক্ষী রেখে গোধূলি পেরিয়ে ঘনাচ্ছে সন্ধ্যাধাঁর। ফেনায়িত তরঙ্গ বালুবুকে ভেঙে পড়ছে প্রবল উচ্ছ্বাসে, একরাশ ঝিনুকের উপহারদান করে ফিরে যাচ্ছে নির্লিপ্ত উদাসীনতায়।
--"বাহ!! রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহের কবিতা!! আপনি তো বেশ রোমান্টিক চরিত্রের মানুষ ম্যাডাম।" পেছন হতে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরে চমকে মুখ ঘোরায় রিমি, হাসিহাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ছয় ফুট লম্বা এক অবয়ব। রিমলেস চশমার অন্তরালে শান্ত ভাবুক দুচোখে মাঝে মাঝেই খেলে যাচ্ছে উৎসাহিত চকিত বিদ্যুৎ, মৃদু বঙ্কিম স্মিতহাস্য রূপোলী ঝালরসম সেঁটে আছে ঠোঁটে।
--"আচ্ছা এই ভরা বসন্তে মুখে শ্রাবণের মেঘ ঘনিয়েছে কেন জানতে পারি? আর একা একা অজানা সমুদ্র সৈকতে বসে আছেন যে সুন্দরী? ভয়-ডর নেই নাকি!!" বালির ওপর রিমির পাশে থেবড়ে বসে জোড়া ভ্রুলতায় বিভঙ্গ তুলে জানতে চায় সে।
--"আচ্ছা আপনার সমস্যাটা ঠিক কোথায় বলবেন? প্রথমত সুন্দরী আমি নই, আর দ্বিতীয়ত কখন কি করি তার জবাব আমি কাউকে দিই না।" যথাসাধ্য মুখ গম্ভীর করে অন্যদিকে চেয়ে জবাব দিল রিমি।
--"বাব্বা!! শান্ত চেহারার আড়ালে তো হিংস্রা বাঘিনী লুকিয়ে আছে দেখছি!! তা আমায় কামড়ে দেবেন না তো?" হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়ে অবয়ব, মুখে কালবৈশাখীর আঁধার ঘনিয়ে ছিটকে উঠে দাঁড়ায় রিমি।
--"হয়েছে আপনার? না চাইতেই উড়ে এসে জুড়ে বসে তখন থেকে যা নয় তাই বলে চলেছেন, অসহ্য!!"
--"আরে, আরে রাগছেন কেন? আপনি না বড্ড তাড়াতাড়ি রেগে যান! বড্ড ছেলেমানুষি স্বভাব আপনার। কবিতা শুনে ভালো লাগল বলেই তো এলাম আপনার কাছে, আজকাল এত গভীর কবিতা পড়ে কজন!! সবটাই উপলব্ধির খেলা বুঝেছেন?বসুন বসুন।" অবাক হয়ে বালির ওপর ফের বসে পড়ে রিমি, সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে অবয়বের দিকে।
--"এই দেখেছেন!! এতক্ষণ কথা বলছি আপনার সাথে, একে অপরের নামটাই জানা হয়নি। আমি অনিক, অনিক রায় কাপূর, আপনি??"
--"রিমি, ইয়ে মানে রম্যাণী সেন। আপনি তো অবাঙালি? তাও এত ভালো বাঙলা বলেন কিভাবে? "উৎসুকভাবে জানতে চায় রিমি।
আকর্ণবিস্তৃত হাসিটিকে আরেকটু চওড়া করে জবাব দেয় অনিক,--"আসলে আমার মা বাঙালি আর বাবা জাঠ সম্প্রদায়ভুক্ত। বাবা ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, মুর্শিদাবাদ ভ্রমণে এসে প্রেমে পড়েন মায়ের, অতএব বিয়ে এবং আমি......।"
---"ও আচ্ছা, আপনারা তবে এখানেই থাকেন?"
--"নাহ নাহ, বাবা এবং পরিবারের বাকি সকলে হরিয়ানায় থাকেন, আমি রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াশুনো করেছি। মা কবি ছিলেন, ওনার সূত্রেই এই ভাষার প্রতি আগ্রহ জন্মায়।"
--"ও আচ্ছা, বুঝলাম।"
--"দেখুন, তখন থেকে নিজের কথা বলে চলেছি, আপনার সম্পর্কেও জানতে ইচ্ছে করে নাকি!! বলুন কিছু।"
--"আমার সম্পর্কে কিছুই জানার নেই।পরিবার পরিজন পরিত্যক্তা, ছোটোখাটো কাজ করে অন্ন সংস্থান করি। সমুদ্রের অগুনতি ঢেউয়ের মাঝে চলমান জীবনের ছন্দ খুঁজতে এখানে আসি প্রতিবার। ব্যাস এটুকুই।"
--"বাব্বাহ, এ যে ঠিক দুই নম্বরের প্রশ্নের উত্তর হলো। মুখে প্রেমের কবিতা মুখ জুড়ে বিদিশার অন্ধকার, সত্যি আপনি বড্ড রহস্যময়ী।"
--"সেরকম কিছুই নয়, কবিতা ভালো লাগে, তাই পড়ি। প্রেমে বিশ্বাসী নই।"
--"মানতে পারলাম না ম্যাডাম। ওই শূন্য চোখে অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছি আমি।বয়সে আপনার চেয়ে কিছু বড়োই হবো, অভিজ্ঞ চোখ পড়তে পারছে কিছু অব্যক্ত বেদনার ভাষা।"
--"আমায় পড়ে কাজ নেই, মুখোশের অন্তরালে থাকা আসল চেহারার সন্ধান কোনোদিন কেউ পাবে না।" অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল রিমি।
--"আচ্ছা আপনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা "বিবাদ" পড়েছেন? না পড়লে পড়ে দেখুন, কেন জানিনা মনে হয় আপনাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা বোধহয় কবিতাটি, শান্ত মুখ আর কোঁকড়ানো চুলের আড়ালে ধ্বংস পুষে রাখেন আপনি। আমি কবিতা লিখতে চাই আপনাকে নিয়ে, পোড়া ছাইয়ে মিশে থাকা মৃত্যুসম কবিতা; লিখতে দেবেন?" রিমির চঞ্চল চোখের তারায় নিজ শান্ত দৃষ্টি অর্পণ করে বলে অনিক।
--"অনেক হয়েছে!! তখন থেকে যা মুখে আসছে বলে চলেছেন। কতবার বলব ভালোবাসায় বিশ্বাস করিনা আমি!! লিখবেন না আমায় নিয়ে কিচ্ছু, বলে দিলাম আপনাকে। আমায় নিয়ে লেখা অভিশাপ বয়ে আনবে, শান্তি নয়।" রক্তবর্ণ মুখে হিসহিসিয়ে ওঠে রিমি, উঠে এগিয়ে চলে নিজ হোটেল অভিমুখে।
--"আরে শুনুন তো!! বড্ড বেশি রাগ আপনার। পুরো কথা না শুনেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন আপনি। আচ্ছা যে কবিতাটি এখুনি আবৃত্তি করছিলেন আপনি, আপনাকে দেখে তারই কয়েকটা লাইন মনে পড়ে গেল,

"এতো ক্ষয়, এতো ভুল জমে ওঠে বুকের বুননে
এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে, কতটা ক্ষরণ
কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায়।"

--"হয়েছে আপনার কাব্য শোনানো? আমায় ফিরতে হবে হোটেলে। কাল সকালের বাস আছে, ফিরে যেতে হবে কর্মস্থলে।" বিরক্ত মুখে বলে রিমি।
---"আচ্ছা একবারও জিজ্ঞেস করলেন না!আমি এখানে কি করছি? আচ্ছা বেশ, আমিই বলে দিই, আমি প্রতিবছর এখানে আসি, মায়ের মৃত্যুদিনে।" আকাশের দিকে চেয়ে বেদনাহত স্বরে বলে অনিক।
--"আপনার মা!!! মানে তিনি....এখানে???" বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে রিমি।
--"মা অন্য সম্প্রদায়ের হওয়ায় মেনে নেননি আমার ঠাকুরদা ও পরিবারের অন্য সদস্যেরা। তাঁদের রোষের হাত থেকে মাকে বাঁচাতে বাবা তাকে নিয়ে এখানকার এক গ্রামে বাসা বাঁধেন। আগেই বলেছি আমার মা কবি ছিলেন, একদিন পূর্ণিমারাতে আচমকাই বৈষ্ণব পদাবলী আওড়াতে আওড়াতে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি, আমার বয়স তখন মাত্র দুই। বাবা আমায় নিয়ে গিয়েছিলেন হরিয়ানায়, কিন্তু ঠাকুরদা মেনে না নেওয়ায় তিন বছর পর মিশনে রেখে যান। খরচাপত্র দিতেন অবশ্য, তিনি এখন একটি জাঠ স্ত্রী রত্ন ও তৎসূত্রে তিনটি সন্তানের জনক।" বালির ওপর হাতের আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটছে অনিক, শব্দ করে পাড়ে আছড়ে পড়ছে জোয়ারের ফলে ফুলেফেঁপে ওঠা বঙ্গোপসাগরের ঢেউ। অন্ধকারে রিমির মুখ এখন প্রায় অস্পষ্ট, নিস্পন্দ বসে রয়েছে সে হাঁটু মুড়ে।

--"পরাজয় এসে কণ্ঠ ছুঁয়েছে লেলিহান শিখা, চিতার চাবুকে মর্মে হেনেছ মোহন ঘাতক। তবুতো পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মুখর হৃদয়, পুষ্পের প্রতি প্রসারিত এই তীব্র শোভন বাহু।"
অনিক যে মৃত মায়ের স্মৃতিতে প্রতিবছর ছুটে আসো এখানে, তার নামটাও জানোনা তুমি? তবে শোনো! তোমার মায়ের নাম ছিল রম্যাণি সেন। আত্মহত্যা করেনি সে, পাগলও হয়নি, তাকে মেরেছিল তোমার বাবার নির্লিপ্ত উপেক্ষা। বিয়ের একবছরের মধ্যেই আকর্ষণ হারিয়েছিল সে, শুধু দেওয়া কথার তাগিদে বয়ে নিয়ে চলছিল এক জটিল সম্পর্ক,আমি মুক্তি দিয়েছিলাম তাঁকে বেনামি সে হৃদিসম্পর্ক থেকে।অনিক তুমি আমার গর্ভজাত নও,এমনই কোনো এক সান্ধ্য প্রহরে সমুদ্রতটেই পেয়েছিলাম তোমায় দুজনে,সেই থেকে তুমি আমাদের সন্তান।তোমার বাবা আমার বিবাহিত স্বামী নন,ছিলেন আত্মার আত্মীয়,আর আমি!! নামহীন এক পাণ্ডুলেখ্য।"
ঠকঠক করে কাঁপছে অনিক, রাতের অন্ধকারের সাথে প্রতিমুহুর্তে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে রিমি। শব্দগুলো হয়ে আসছে ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর। নক্ষত্রময়ী নিঃশব্দ রজনীপাতে দূর হতে শোনা যাচ্ছে অজানা পাখির ডাক।সম্মুখে সুনীল জলরাশিবক্ষে তখন হাজার আলোকবিন্দু।
---"কিছুটা আঘাত অবহেলা চাই
প্রত্যাখ্যান সাহস আমাকে প্ররোচনা দেয়
জীবন কিছুটা যাতনা শেখায়,
ক্ষুধা ও খরার এই অবেলায়
অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই।"

আর এসো না অনিক এখানে, শান্তিতে ঘুমাতে দাও সমুদ্রবক্ষের ফেনিল শুভ্রতায়, যেথা সম্পর্কের পিছুটান নেই, নেই আবেগের টানাপোড়েন, ভালো থেকো।"
অন্ধকার কাটিয়ে আকাশে ফুটে উঠেছে হালকা আলোর রেখা, একটু একটু করে জেলেরা আসতে শুরু করেছে এদিকে, সাগরপানে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে অনিক, দূরে কোথাও ভেসে আসছে গান----
"ভালো আছি ভালো থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো"........আজ দোলপূর্ণিমা।।

(সমাপ্ত)

বিশ্বরূপ চক্রবর্তী



ছোটগল্প



অন্ধকূপ

শান্তিপুর। পুরুলিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রাম।জায়গাটা ভারি অদ্ভুত। এই গ্লোবালাইজেশনের যুগেও বিন্দু মাত্র বদলায় নি।প্রকৃতি যেন নিজ্ব বক্ষে আঁকড়ে রেখে গ্রামটাকে। গ্রামের বেশির ভাগ পরিবার ই অত্যন্ত গরিব। টেনে টুনে সংসার চলে যায় এদের। গ্রামেই থাকত গোবিন্দ ও মঞ্জুরি। এদের মেয়ে স্নেহাশ্রী। আদর করে সবাই স্নেহা বলেই ডাকে। কী আদুরে আর দুষ্টু মেয়ে! সারাদিন এই দিক ওই দিক করে সময় চলে যায়। তেমন বুদ্ধিমতী এই মেয়ে।গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার মদনমোহন বাবু সব সময় প্রশংসা করেন এই বছর দশের এই মেয়ের। খেতের জমির মাঝে আলগুলো দিয়ে স্নেহা খেলত, ঘুরত।
"স্নেহা মা ওরকম করে না। লেগে যাবে!" আদরের মেয়েকে বার বার মঞ্জুরি বারণ করত। টেনে টুনে সংসার চালানো এই গোবিন্দ মেয়েকে খুব ভালোবাসত।
"আমাদের মেয়েকে অনেক বড়ো করতে হবে।
পারবি তো তুই স্নেহা!"
স্নেহা মাথা নাড়ত। মন দিয়ে পড়াশোনা করত। একদিন সে তার প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার মদনমোহন বাবুকে জিগেস করে,
"স্যার কিভাবে আমি আমার বাবা মায়ের কষ্ট মুছে ফেলব!"
"এত ছোট মেয়ের মুখে এ কি কথা!ভালো করে পড়াশোনা কর। অনেক বড়ো হবি তুই!"
সময় চলতে থাকে। একদিন ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে মাটিতে মাথা ঘুরিয়ে পরে যায় গোবিন্দ। সবাই ধরে বেঁঁধে বাড়িতে নিয়ে আসে।
"কি হয়েছে বাবা?"
"ও কিছু নয়।"
"মা বাবা কে ডাক্তার দেখাবে না?"
"হ্যা দেখাবো। কি হল সুস্থ মানুষটার!"
এলাকায় ফিরেছে জিতেন। কলকাতায় কাজ করে এই জিতেন। কি কাজ সেটা অবশ্য কেউ জানে না। এলাকায় ধনী বলতে জিতেন কে সবাই বলত। বাড়িতে বাবা, মা আছে। ছেলেকে নিয়ে বেশ গর্ব তাদের। এবার দিন পনেরো থাকবে।গোবিন্দদার অসুখ শুনে সে কিছু টাকা দিয়ে আসে। ডাক্তার দেখানো হয়। তিনি কিছু টেস্ট দেয়।
সরকারি হাসপাতালে গিয়ে সেগুলো করানো হয়।
বাড়িতে আসে স্নেহা। ঘরে লোকজন ভর্তি। মায়ের চোখে জল। বাবা বিছানায় শুয়ে আছে।
"কি হয়েছে মা!"
"কিছু হয় নি। তুই যা! "
কেউ কিছু বলতে চাইছে না। যে স্যার তাকে সব উত্তর দেন, তিনিও আজ চুপ। ঘর থেকে বেরিয়ে যায় মনমরা হয়ে স্নেহা।বাইরে জিতেন দা বিড়ি খাচ্ছে।
"ও জিতেন দা!"
"আরে পুচকি! কেমন আছিস?"
"তুমি বলো না বাবা কেমন আছে?"
"তোকে কেউ কিছু বলে নি। অবশ্য তুই এত ছোট!"
"আমায় বলো না!"
"তোর বাবার ক্যানসার হয়েছে। উনি আর বেশি দিন...."
মনে পরে যায় স্নেহাশ্রীর স্যারের কথা।
"ক্যানসার হল সব থেকে মারণ রোগ। প্রথমত ঠিক মত নিরাময়ের ওষুধ নেই, আর যা আছে তা আমাদের সাধ্যর বাইরে।"
বছর দশের স্নেহার চোখে জল চলে আসে।দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে সে।
"বাবা তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো!"
"না রে যাব না।" হেসে উত্তর দেয় গোবিন্দ।স্নেহা আজ স্কুলে প্রথম হয়েছে পরিক্ষায়, এত আনন্দের দিনটা যে তার জীবন এর সব থেকে খারাপ দিনে পরিণত হয়ে যাবে, সে জানতই না। আজকাল সে আর দুষ্টুমি করে না। বাবার শরীর খারাপ, মাকে সংসার চালাতে হয়। তাকে দেখার জন্য যে মা নেই সে বুঝে গেছে। পাশের পুকুড়ে গিয়ে বসে চুপ করে বসে ঢিল ছুড়ত।
"কিরে স্নেহা? এখানে একা একা?"
"না এমনি! জিতুদা।"
"কি এত ভাবছিস!"
"অনেক কিছু!"
"কি আমিও শুনি!"
"আমি যদি বড়ো হতাম, বাবাকে ডাক্তার দেখিয়ে ভালো করে তুলতাম। মাকে এত কস্ট করতে হত না। ঠিক তোমার মত!"
মাথা নাড়িয়ে বলে স্নেহাশ্রী।
"টাকা রোজগার করবি?"
"আমি বাচ্চা মেয়ে কিভাবে করবো!"
"কলকাতা যাবি? "
"কিন্তু জিতুদা আমি পারব? আমার ভয়...."
ককিয়ে ওঠে স্নেহা।
খানিকক্ষণ ভেবে আবার বলে, "মা আমাকে যেতে দেবে না মনে হয়।"
জিতু যেন কি সব ভেবে নেয়।
"আরে এই সব ছোট সমস্যা নিয়ে না চিন্তা করে চল। অনেক টাকা পাবি, পড়াশোনা করবি। তুই ও ভালো থাকবি, তোর বাবাও!"
"আমায় পড়াশোনা করতে দেবে? সত্যি বলছ জিতু দা?"
"হ্যা রে সত্যি বলছি। অনেক ভালো থাকবি।এই গ্রামে থেকে কিছু হবে না।"
স্নেহাশ্রীর মনে পরে যায় মদনমোহনবাবুর কথা।
"জানিস স্নেহা, যারা ভালো পড়াশোনা করে, তারা এখান থেকে কলকাতায় বড়ো বড়ো জায়গায় পড়তে চলে যায়। আমার বিশ্বাস, তুই ও যাবি! "
স্বপ্নপূরণ যে এত সোজা ভাবতেই পারছে না ও। জিতুদা কে যেন তার জাদুকর মনে হচ্ছে। সব সমস্যার সমাধান সে কয়েক মুহুর্তে করে দিতে পারে।
"তাহলে কালই বেরোব। কাউকে বলবি না।তাহলে যেতে দেবে না।"
"কিন্তু মাকে একবার...
"
"না একদম নয়। বউদির এমনি মন মেজাজ খারাপ আর তুই....! ভরসা রাখ আমার উপর!"
"এখন বাড়ি যাচ্ছি। কাল তাহলে চলে যাব। "
আনমনে বাড়ির দিকে এগোছে থাকে ছোট স্নেহা। চেনা পুকুর, ক্ষেতের মাঝের আলগুলোকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না তার। কিন্তু না, বাবার জন্য তাকে যে যেতেই হবে।অনেক পড়াশোনা করতে হবে, টাকা পাঠাতে হবে। বাচ্চা মেয়েটি এক দিকে যেন বেশ আনন্দ পাচ্ছিল, অন্য দিকে কষ্ট পাচ্ছিল প্রচন্ড। বাড়িতে ঢুকতেই মায়ের চিৎকার,
"কিরে! এত ক্ষণ কোথায় ছিলিস! খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে যাচ্ছি! "
"মা, একটু খেলছিলাম..."
"যা স্নান করে আয়। খাইয়ে দেব।"
ছোট স্নেহার কান্না কান্না পায়। মা বেশ আদর করে খাইয়ে দেয়। কিছুক্ষন পর মায়ের আচলে শুয়ে ঘুমিয়ে পরে স্নেহা।
সকালে উঠে পড়ে। বাবা ঘুমাচ্ছে। মা কাজে গেছে। চটপট জামাকাপড় গোছাতে থাকে।মা, বাবার একটা ছবিও নিয়ে নেয় পুটলিতে। এক দৌড় দেয়। বাঁশবাগানে দাঁড়িয়ে ছিল জিতু।
"আরে চলে এসেছিস? চল চল। বাস ধরতে হবে যে!"
"মা, বাবার জন্য মন খারাপ করছে!"
"আরে তুই তো কাজ করতে যাচ্ছিস। তোর বাবা, মা গর্ব করবে জানলে। আমার কথা কাউকে বলেছিস?"
"মাকে বলা হয় নি। মা খুব কাঁদবে। "
"আমি বউদিকে বলে দেব। এবার চল দেরি হয়ে গেল।"
হাটতে থাকে দুজন। ঘন্টাখানেক হেটে আসে মেন রোডের ধারে।
"চল ওঠ! "
এই প্রথম বাসে উঠল স্নেহা। কোনো দিন যে গ্রামের বাইরে যায়নি।
বেশ আনন্দ হচ্ছে তার।
সিটে বসে।
"কিরে গলা শুকিয়ে গেছে? "
"হুম জল আছে তোমার কাছে?"
"এই নে!"
বাস এগোতে থাকে দ্রুত গতিতে। ঘুমিয়ে পরে স্নেহা।
"হ্যালো?"
"কোথায় জিতু?"
"আসছি বাসে। তুই শিয়ালদাতে দাঁঁড়াবি।আমি পৌঁঁছে যাব। "
"মাল ভালো তো?"
"একদম কচি! আমার ভালো দাম চাই!"
"সে সব নিয়ে কখনও চিন্তা হয়েছে তোর! সব রেডি!"
ফোনটা কেটে দেয় জিতু। মুখে চওড়া হাসি।বাস থেকে নেমে ট্যাক্সি নেয় জিতু।
"দাদা শিয়ালদহ স্টেশন!"
"জিতুদা আমরা কোথায়! কী সুন্দর সুন্দর গাড়ি! কত বড়ো বাড়ি গো! কী দারুণ রাস্তা ঘাট! সব তো বইতে পড়েছিলাম। "
"আমি বলেছিলাম না! আচ্ছা একটু জল খেয়ে নে!"
জল খায় স্নেহাশ্রী। মাথাটা ঝিমাচ্ছে। ঘুমিয়ে পরে আবার। জলের বোতলে বেশ ভালো করেই ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছিল জিতু।
গন্তব্য শিয়ালদহ চলে আসে। নামতেই দেখা হয় সুবোধের সাথে!
"আরে ভাই!"
আলিঙ্গন করে দুজন।
"উফ এ তো বিষন কচি!"
"টাকা দে মাল নে!"
"এই নে।"
কুড়ি হাজার টাকা জিতু কে দেয় সুবোধ।
জিতু স্নেহা কে ডাকে।
"এই কাকুর সাথে যা। আমি আসছি!"
চলে যায় জিতু, ভিড়ের মাঝে কোথায় যেন!
বাচ্চা মেয়ে, তারপর ওষুধ! কিছু বলার আগেই এত কিছু হয়ে যায়।
একটা ট্যাক্সি নেয় সুবোধ।
"দাদা শোভাবাজার!"
"আমরা কোথায় যাচ্ছি! "
"তোমার জিতু দাদার কাছে! নাও জলটা খেয়ে নাও।"
এক প্রকার জোর করেই, জলটা খাইয়ে দেয় স্নেহাকে। রাস্তা যে দেখতে দেওয়া যাবে না।
শোভাবাজার আসতে নেমে যায় ওরা।স্নেহাশ্রীকে জোর করে উঠিয়ে দেয়।
"কাকু আমি আর পারছি না!"
"আর এক্কটু চল। চলে এসেছি।"
মাথা ঘুরছে, সারাদিনের ক্লান্তি আর পারছে না স্নেহা। গ্রামের কথা যে বড্ড মনে পড়ছে।
চার দিকে এত বড়ো বড়ো বাড়ি। গাছ পালা নেই বললেই চলে। কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে শ্নেহাশ্রীর। একটা থেকে আর একটা গলি, টানতে টানতে সুবোধ নিয়ে যাচ্ছে স্নেহাশ্রীকে।
"আহ লাগছে! হাতটা..."
শোনেই না সুবোধ। হঠাৎ একটা বাড়িতে ঢুকে যায়। বাড়িটা দেখে কেমন ভয় ভয় লাগছে স্নেহার। কত মেয়েকে দেখছে কেউ তার দিদির বয়সি তো কেউ মায়ের! সুবোধ একজন বয়স্ক মহিলার কাছে নিয়ে গেল।
"একদম টাটকা মাল আছে!"
বয়স্ক মহিলা তাকালো স্নেহাশ্রীর দিকে।
"ওই ছোকরি নাম কি?"
"স্নেহা।"
"আমার পছন্দ হয়েছে। অর্জুন সুবোধ কে হিসাব মিটিয়ে দে!"
"কোথায় যাচ্ছ সুবোধ কাকু? জিতু দা কোথায়?"
"এখানে অনেক টাকা পাবি? এরা পড়াশোনা করাবে। ভালো থাকিস!"
খুব তাড়াতাড়ি বলে চলে যায় সুবোধ।
"চল ছোকরি।"
একটা ছোট ঘুপচি ঘরে ঢুকিয়ে দেয় স্নেহাকে।
"শোন তোকে চুলবুলি বলে ডাকব। অভ্যাস করে নে!"
"কিন্তু..."
"কিছু কিন্তু নয়। ওই রেশমি নতুন মাল। কাজ বলে দে, শিখিয়ে দে। কাল থেকে কাস্টমার দেব। সাজিয়ে দিবি।"
"এ যে খুব বাচ্চা! "
"যত কচি, তত দাম বেশি। তুই বেশি কথা বললে এবার!"
বেরিয়ে যায় বয়স্ক মহিলা।
"আমি কাজ করব! "বেশ আনন্দ পায় স্নেহা।
বাচ্চা মেয়েটাকে দেখে বেশ মায়া লাগছিল রেশমির।
"তুই খুব খারাপ জায়গায় এসে পড়েছিস।হয়ত আর কোনো দিন!"
"কি হয় এখানে?"
সন্ধ্যা হয়েছে। সাজিয়ে দিয়েছে রেশমি স্নেহাকে। সে খুব খুশি। এত সাজেনি কোনো দিন।
"রেশমি বেরো!"
বয়স্ক ভদ্রমহিলা একজন ভদ্রলোক নিয়ে ঘরে ঢুকে যায়।
"এ যে খুব বাচ্চা!"
"আপনি আপনার মত কাজ করে নিন না!"
হেসে বলে বয়স্ক মহিলা। তারপর বেরিয়ে যায়।
ভেতরে চলে মানবতার ধর্ষন! রেশমি দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে, সে নিরুপায়। কাস্টমার বেড়িয়ে গেলে সে ঘরে ছুটে যায়। নগ্ন বাচ্চা মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে।
"আমার খুব লাগছিল দিদি! কাঁদতে থাকে স্নেহা।
নিজের উপর খুব রাগ হয় রেশমির।
"আজকে রাতে এখান থেকে বের করে দেব তোকে। পালিয়ে যাবি যত দূর পারিস!"
বাইরে থেকে আওয়াজ আসে।
"রেশমি তোর কাস্টমার.।"
রেশমি চলে যায়। রাত ঘনিয়ে আসে।
"এই ওঠ স্নেহা। চল চটপট!"
স্নেহা তৈরী হয়ে নেয়।
একের পর এক ঘর পার হচ্ছে রেশমি স্নেহাকে কোলে নিয়ে। সামনেই দরজা। আর কয়েক পা বাড়ালেই মুক্তি।
কোল থেকে নামাতে যাবে রেশমি স্নেহাকে, সেই সময়,
"খুব কষ্ট হচ্ছে না রেশমি!"
সপাটে চড় মারে বয়স্ক মহিলাটি।
"সুমন ওকে নিয়ে যা রেশমিকে। বড্ড বার বেড়েছে!"
টানতে টানতে নিয়ে চলে যায় রেশমিকে সুমন। ভাড়াটে গুন্ডা তো।
"এই শোন ছোকরি। অনেক টাকায় তোকে কিনেছি। পালাতে আর পারবি না!"
অন্ধকার গ্রাস করেছে। যে আলোকে মনে হল এই ছুঁয়ে ফেলছি, সেটা যেন উধাও হয়ে যায়। ওকে টানতে টানতে নিয়ে ঘরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর কোনো দিন রেশমিদিকে দেখতে পারে নি স্নেহা। প্রথম প্রথম খুব কস্ট হত। দিনের পর দিন চলে গেছে, বছরের বছর নেমে এসেছে। কিছুই পালটায়নি। ছোটোবেলার স্মৃতিগুলো এখন আবছা। আজ যে সে সমাজের অপরাধী, দাগী বেশ্যা! অপরাধ কি করেছিল? স্বপ্ন দেখেছিল? বাবা কে বাঁচাতে চেয়েছিল?পড়াশোনা করতে চেয়েছিল? না দোষ ওর নয় আমাদের সমাজের! আমরাই আসল অপরাধী। বার বার ভুলে যাই এরাও মানুষ, এদের ও জীবন আছে। না হয় আজ নিজেই বদলাই, কাল অন্যদের বলবো!

(সমাপ্ত)