এখন তরঙ্গ তে লেখা পাঠান প্রতিমাসের ৫ থেকে ২০ তারিখ অবধি

প্রভাত চৌধুরী



কবিতা (সাধারণ বিভাগ)




শাল্যদানী-র একটি কবিতা পড়ে

সবুজের কথা উঠলেই 'সবুজপত্র '-র পাশে
আমার পানপাতা
আর বনাঞ্চল থেকে যে পাখিটি বেরিয়ে আসে
তাকে আমরা টিয়া নামে চিনি
সব চিনি-ই মানসকুমার হয় না
কেউ কেউ ডালিমকুমার নামেও
শিশুপাঠ্যে বিরাজ করে
আর সবুজ-এর পাশে এসে বসে পড়ে অবুঝ
এই অবুঝকে বোঝার কিছু নেই
আমাদের যাবতীয় বোঝাবুঝি
কেবলমাত্র একটি বোঝাকে কেন্দ্র করে
আর ভারবহনের জন্য
গর্দভ নামক একটি
নিরীহ প্রাণীকে টেনে আনতে পারলেই
যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝিরও অবসান
হয়ে যাবে, কেবলমাত্র এটুকু বলে
থেমে যাবো, থেমে যেতে হয় বলেই

২৪.০৩.২০১৮ | ১৯:৩৫






সুন্দরের দিকে
(দ্বিতীয় পর্ব )




৫২

সুন্দরের দিকে-কে পর্ব বিন্যাস করলাম। এতদিন ছিলাম সাম্প্রতিক কবিপত্র পরিচয় ইত্যাদি পত্রপত্রিকার  সাজঘরে । ওখানের ড্রেসিংরুমে যা দেখেছিলাম তার সবটুকু লেখা হয়নি । চেষ্টা থাকবে সেই ফাঁক ফোকরকে পরবর্তী কোনো সময়ে ভর্তি করার । বললেই যে সবটা ভরাট করা যাবে, তার গ্যারান্টি দেওয়া সম্ভব নয়।এখন এসব নিয়ে ভাবতে যাবো কেন ? এখন শ্যামলে শ্যামল আমি নীলিমায় ঠিক কোন রং ছিল  আমার, তা দ্যাখার চেষ্টা করা যাক ।

শ্যামলদার সঙ্গে ঠিক কবে দ্যাখা হয়েছিল, তা মনে করতে পারছি না । তাহলে তারিখ হিসেবে বসিয়ে দিলাম পয়লা বৈশাখ ।
নতুন শুরুর জন্য পয়লা বৈশাখ একটি  উপযুক্ত তারিখ । কেননা সেদিনের গতকালের সঙ্গে সেদিনের আজকের  পার্থক্যটা বোঝানোর জন্য এর থেকে ভালো তারিখ আমার জানা নেই ।
ওই পয়লা বৈশাখের সকালে পবিত্রদার ২২ বি, প্রতাপাদিত্য রোডের বাড়িতে  আড্ডা চলছিল । হঠাৎই বিনা নোটিশে হাজির হলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। হলুদ রঙের পাঞ্জাবি, পাটভাঙা সাদা ধুতি । বলতে দ্বিধা নেই  আমার তখন শ্যামলদার সঙ্গে পরিচয়ও ছিল না । সেটা যে কোনো সমস্যা নয় তা শ্যামলদারই অবদান । শ্যামলদার কাছে পরিচিত এবং অপরিচিত -র কোনো ব্যবধান ছিল না । এটা দিয়েই শুরু করলাম শ্যামল -চর্চা । একজন বড়ো মাপের মানুষ যে বড়ো মনের মানুষ হয়, তা শ্যামলদাকে কাছ থেকে না দেখলে জানতেই পারতাম না । পরবর্তীতে সুনীলদা বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়েরও ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখেছি ।
আমাদের কবিপত্রর আড্ডায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাজির হওয়ায় আমরা বেশ খুশি । আগেই শুনেছিলাম শ্যামলদার আনন্দবাজার থেকে যুগান্তর হাউসে চলে  আসার রোমহর্ষক ঘটনাবলি । এবং এটাও কানে এসেছিল যে শ্যামলদাকে অমৃত পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হবে । আমরা সকলেই উদ্বেলিত । কিছুক্ষণ শ্যামলদা তাঁর বর্তমান  অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বিশদে জানালেন ।পরে প্রায় বগলদাবা করে নিয়ে গেলেন তাঁর বাড়িতে ।
বলে রাখা ভালো,  আমার বইয়ের আলমারিতে তার আগেই জায়গা করে নিয়েছে কুবেরের বিষিয়ে আশয়। আমি জেনে গিয়েছিলাম শ্যামলদার ক্ষমতা । কৃত্তিবাস -এ প্রকাশিত বিদ্যুৎচন্দ্র পাল  - কে নিয়ে অনবদ্য গল্পটি পড়া ছিল আমার । সেই শ্যামলদার বাড়িতে আমার মতো একজন তরুণ কবিতালেখকের উপস্থিতি ছিল এতটাই অকস্মাৎ যে আমি অনেকটাই বিহ্বল ।
পরে  আমার জন্য  অপেক্ষা করছিল আরো অনেক বিহ্বলতা ।
শ্যামলদা অর্ডার করলেন বোতল এবং গ্লাসের। ইতি বউদি স্বয়ং দিয়ে গিয়েছিলেন সেসব।
জলযাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরেই বাজখাঁই গলায় আমার  উদ্দেশ্যে বললেন, প্রভাত তুই নাচতে পারিস?
আমি তো পার্ক হোটেলের ইনস  অ্যান্ড আউটে তখন নিয়মিত নাচি। নাচ  আমার তখন নিত্য চর্চা বা নিত্যকর্ম । পেটে তখন তন্দ্রা  আসতে শুরু করেছে ।
বললাম -নাচতে পারবো না কেন ।
উত্তরে শ্যামলদার স্নেহের হুঙ্কার ---মলিমা একটা রেকর্ড চাপিয়ে দাও তো মা, প্রভাত নাচবে।
মলি বা মল্লিকা শ্যামলদার বড়োমেয়ে। পিতৃ - আজ্ঞা পালন করলো মুখ বুঝে।
নৃত্য -বিশারদ প্রভাত চৌধুরী শুরু করে দিন তার নাচ।
কেমন নেচেছিলাম তার উত্তর  আমার কাছে নেই । মলি সম্ভবত বলতে পারবে।
তবে এই নাচ দেখেই শ্যামলদা আদেশ লিখেছিলেন, পরদিন বিকেলে অমৃত দপ্তরে যেতে।
আমি ভেবে নিয়েছিলাম,  আমাকে হয়তো ওখানে গিয়ে নাচ দেখাতে হবে।




৫৩

হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকে বাগবাজার স্ট্রিট । দূরত্ব  অনেকটা । তবু যেতে তো হবেই । আর যাবার জন্য আছে ৩ নম্বর বাস। দোতলা বাস, লাল রঙের ।বাসের গায়ে বাঘের মুখ। অর্থাৎ কিনা সরকারি বাস।কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিগমের । খিদিরপুর থেকে বাগবাজার । তো চেপে গেলাম ।সেদিন  উত্তেজনায় অফিস যাইনি। দোতলার জানালার ধারে বসে কলকাতা এবং তার মহার্ঘ রূপ দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম বাগবাজার ।সেখান থেকে অমৃত দপ্তর । যুগান্তর -এর উল্টো দিকে । একতলার ৩-৪ টি ঘর নিয়ে দপ্তর । ভেতরের ঘরে একটা বড়ো টেবিলের পেছনে শ্যামলদার চেয়ার। আমি সোজা ঢুকে পড়লাম ঘরে।
এসে গেছিস, বসে পড়।
টেবিলের এদিকে বেশ কয়েকটি চেয়ার। তার একটি দখল করে বসে পড়লাম ।
শ্যামলদা পরিচয় করিয়ে দিলেন কমল চৌধুরী এবং বিদ্যুৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে । ওনারা দুজন  অমৃত-র স্থায়ী কর্মচারী ছিলেন । মণীন্দ্র রায়ের আমলেও ছিলেন। ছিলেন বেশ দাপটের সঙ্গে ।
শ্যামলদা এসে যাওয়ার পর এদের অবস্থা কী দাঁড়াবে তা তখনো জানা যায়নি।
শ্যামলদার লক্ষ্য ছিল তাঁর মনের মতো করে পত্রিকা প্রকাশ করার । অর্থাৎ আগে অমৃত যেভাবে বা যে ফরম্যাটে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হত, শ্যামলদা চেয়েছিলেন সেই ফরম্যাট বদলে দিতে । কারণ শ্যামলদা তাঁর পুরোনো কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তাঁর সম্পাদনা সম্পর্কে জ্ঞান কারো থেকেই কম নয়। পরিকল্পনা তৈরি করতে তিনি দক্ষ ।
তার শুরু হল পরিকল্পনা ।
প্রথমেই স্থির হল--প্রতি সংখ্যায় থাকবে কভারস্টোরি। বাংলা সাহিত্যপত্রে শ্যামলদাই প্রথম ব্যক্তি, যাঁর মাথা থেকে বের হয়েছিল কভারস্টোরির কনসেপ্ট । এটা কোথাও উল্লেখিত হয়েছে কিনা জানি না তবে আমার পড়ার  অভ্যেস চিরদিনই কম।
কভারস্টোরির বিষয়-নির্বাচন শ্যামলদা নিজেই করতেন। অন্যের পরামর্শ মন দিয়ে শুনতেন । পছন্দ না হলে মুখের ওপর বলে দিতেন ।
ঠিক হয়েছিল পবিত্রদা প্রতি সংখ্যাতে এক পৃষ্ঠার সাহিত্য -বিষয়ে একটি গদ্য লিখবেন।বিষয় নির্বাচনে পবিত্রদা স্বাধীন । তার অর্থ হল পবিত্রদা নিজের মতামত প্রকাশের  একটা বড়ো প্ল্যাটফর্ম পেলেন । আমরা সকলেই খুব খুশি । ভাবলাম, যাক আমাদের একটা হিল্লে হয়ে গেল।
আমার পেলাম সমালোচনা বিভাগের কাজ। কোনোদিন নাটক, কোনোদিন সিনেমা, কোনোদিন বা চিত্র প্রদর্শনী । দেখে এসো, লেখা জমা দাও। এভাবে কোনো সপ্তাহে তিনটি । আবার কোনো সপ্তাহে চারটি ।
কিছুদিন পর আমাকে বললেন একটা ব্রিফকেস কিনতে।
নতুন একটা ব্রিফকেস কিনে নিয়ে দেখালাম শ্যামলদাকে।শ্যামলদার ব্রিফকেসটি পছন্দ হয়েছিল বলেই বলে দিলেন ---আজ থেকে তুই আমাদের প্রভাতবন্ধু। তোর কর্মস্থল হল চিৎপুর।




৫৪

সেই নতুন কেনা ব্রিফকেসটিতে। কী ছিল, তা জানার অধিকার তো পাঠকের থাকবেই।এমনকি  আমারও তা জানানোটা বাধ্যতামূলক । জানাবো অবশ্যই । তবে তা সময় মতো জানানো যাবে। ব্রিফকেস খোলার  আগে জানাতে যাবো কেন। আগে পৌঁছতে হবে চিৎপুরের যাত্রা পাড়ায়। যাত্রা কোম্পানিগুলির অফিসে ।
আগে বাগবাজার থেকে ফেরার কথাটা জানিয়ে রাখি । আমাকে শ্যামলদার কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত । তেমনই  আদেশ ছিল । এটা কোনো লিখিত সার্কুলার ছিল না, অথচ যা ছিল তা লেখার ওপরে। কোনো নড়চড় হবার জায়গা ছিল না । এটা সকলেই জানতেন।
অমৃত থেকে সোজাসুজি বাড়ি ফেরা হত না । সেটা নির্ভর করতো শ্যামলদার মর্জিমাফিক । আমি তখন জড়বস্তুর মতো। এটা কিন্তু কখনোই পরাধীনতা বলে মনে হয়নি।
আসলে শ্যামলদা ঠিক  আমার মতো একজনকে চেয়েছিলেন, যা আর কারো মধ্যেই ছিল না । আমি কি তাহলে শ্যামলদার  ইয়েস ম্যান ছিলাম ? এই প্রশ্ন যে কেউ করতেই পারেন, কিন্তু আমি এর উত্তর দিতে বাধ্য নই । উত্তর দেবার দায়িত্ব শ্যামলদার । ক্ষমতা থাকলে শ্যামলদার কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারেন ।

অধিকাংশ দিন , অন্য কোনো কাজ না থাকলে প্রেস ক্লাবে যেতাম । প্রেস ক্লাবে শ্যামলদার আধিপত্য ছিল । আমরা বাগানে বসতাম । একটা টেবিল, আর সেই টেবিলকে ঘিরে খানকয়েক চেয়ার।টেবিল এবং চেয়ার বলাবাহুল্য প্ল্যাস্টিকের। চেয়ারের সংখ্যা নির্ভর করতো সেদিনের হিসেব মতো।অর্থাৎ কতজন শ্যামলদাকে কেন্দ্র করে বসতে চাইতাম তার ওপর নির্ভর করতো চেয়ারের সংখ্যা । আমার প্রিয় ব্রিফকেসটি তখন প্রেস ক্লাবের ঘাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জাবর কাটতো।
শ্যামলদার ছোটো ভাই তাপস গঙ্গোপাধ্যায় মাঝেমধ্যে তাঁর সঙ্গীসাথী সমেত আমাদের টেবিলে যুক্ত হতেন।তাঁদের মধ্যে একজন অদ্ভুত একটা কল্পলোকে বিচরণ করতেন । এসেই তাঁর প্রথম কথা ছিল --- আজ তিনটি।তিন আঙুলের সাহায্যে তিনকে চিহ্নিত করতেন। এই ইঙ্গিতময়  আঙুলের সাহায্যে বা অঙ্গুলিহেলনে তিনি বোঝাতে চাইতেন , আজ তিনি তিনজনকে খতম করে এসেছেন।যেদিন তিনি আঙুল ব্যবহার করতেন না, সেদিন আমার মন খারাপ হয়ে যেত।ভাবতাম, আহা, আজ দিনটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল। কী একটা হবার ছিল, অথচ হল না ।
আর এক জন ছিলেন পিনাকী, যিনি বিভিন্ন  অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন । নৌকোতে দাঁড় বেয়ে আন্দামান পারি দিয়েছিলেন ।
শ্যামলদাকে এরা সকলেই একশো পার্সেন্ট শ্রদ্ধা করতেন । শ্যামলদার ভাই তাপস বারাণসী নিয়ে একটি অমূল্য লেখা লিখেছিলেন । বার্ধক্যে বারাণসী -র ওপর সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা বা প্রতিবেদন ছিল ওই লেখাটি । একজন সাংবাদিক কীভাবে সংবাদ পরিবেশন করবেন, তার প্রকৃত উদাহরণ এই লেখাটি । জানি না এই লেখাটি জার্নালিজমে পাঠ্য আছে কিনা ।
আমাদের আড্ডার কোনো ধরাবাঁধা গত ছিল না, অথচ বিষয়ের অভাব হত না । অন্তরিক্ষ থেকে উঠে আসতো বিষয়। সেই বিষয়ের ডাল ধরতে সক্ষম হলেই চালিয়ে যাওয়া যেত।
শ্যামলদা মনেপ্রাণে জাতীয়তাবাদের সমর্থক ছিলেন । কিন্তু আমার মার্কসবাদী চিন্তাচেতনার সঙ্গে কখনোই বিরোধ ঘটেনি । হলে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য একান্নবর্তী থাকতে পারতাম না ।





৫৫

একান্নবর্তী শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল --একসঙ্গে রান্না -খাওয়া হয় যে - পরিবারে / যৌথপরিবারভুক্ত।
আমি শ্যামলদার সঙ্গে  আমার একান্নবর্তী পরিবারের কথা লিখেছিলাম । এই শব্দটি  অভিধান থেকে উড়ে এসে সুন্দরের দিকে ঢুকে পড়েনি । অভিধানে ঠিক যেমনটি লেখা আছে ঠিক তেমনটাই ছিল এই যৌথপরিবারটি। এটা কোনো অতিশয়োক্তি নয়। আবেগঘন স্মৃতিচারণ নয়। যাঁরা দেখেছেন তাঁদের মধ্যে জীবিত  আছেন । তাঁদের কেউ কেউ অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু সকলেই অস্বীকার করবেন এমনটা আমি বিশ্বাস করি না ।

শ্যামলদার সঙ্গে সঙ্গে  অবশ্যই বলা উচিত ইতি বউদির কথা । ইতি বউদি ছিলেন শ্যামলদার পরিপূরক । প্রকৃত অর্থেই পরিপূরক । আমার দ্যাখা এবং জানা শ্রেষ্ঠ দম্পতি --শ্যামলদা এবং ইতি বউদি ।
পরিবারের বাইরের মানুষজনকে কীভাবে বা কী কৌশলে আপন করে নিতে হয় তার একমাত্র উদাহরণ ইতি বউদি ।
অনেকেই খুবই ভালো রান্না করেন। কিন্তু ভালো রান্নার ভালো ভাবে খাওয়ানোর যে অমোঘ বিদ্যাটি বউদি জানতেন, তা কোনো বিদ্যায়তন থেকে শেখা যায় না । শেখার জন্য ব্যবহার করতে হয় অন্তঃকরণ নামক একটি শব্দ । এই শব্দটি দ্যাখা যাই না, অনুভব করতে হয়। আর তা অনুভবের জন্য প্রয়োজন একটি বিশেষ অর্গানের। আমার মতো প্রায় নিরক্ষর মানুষ যেটা বুঝতে পারতো , জ্ঞানী-গুণী মানুষজন যে সেটা বুঝতে  সক্ষম হতেন, এটা ধরে নিতেই পারি ।
প্রায় প্রতিদিনই শ্যামলদার বাড়িতে খাওয়াটা আমার বাধ্যতামূলক ছিল । এমনকি সকাল -সন্ধে দুবেলা। এসব ভুলে যাবো কীভাবে ? এসব কি ভোলা যায়? না, ভুলে যাওয়াতে কোনো পুণ্যার্জন করা যায়? গেলেও আমি সেই পুণ্য কে বর্জন করি । শ্যামলদা কিংবা বউদির কাছে যে ঋণ করেছি, তা শোধ করার জন্য  আমাকে একশো বার জন্মাতে হবে। আর আমি তো পুনর্জীবন শব্দটিকে কোনোদিনই চোখভরে দ্যাখার সুযোগ পাইনি ।
এই সুযোগ যে কেবলমাত্র আমিই পেয়েছিলাম এমনটাও নয়। অনেকেই ছিলেন । নাম ঘোষণা কি খুবই জরুরি ? জরুরি নয়--এই সিদ্ধান্তটি আমাকেই নিতে হল।
খাবার ফিরিস্তি দেওয়ার থেকে বলে রাখি যেসব খাবার বাঙালিদের পছন্দের তালিকার মধ্যে মুদ্রিত আছে তার থেকে দু-চার টি অবশ্যই বেশি হবে । যাঁরা হিংসে করবেন, তাঁদের জানিয়ে রাখি, এই ধরণের মানুষ খুব বেশি কপি ছাপা হয় না । এজন্যই  এঁদের জন্য দুর্লভ শব্দটি অভিধানে স্থান পেয়েছে ।এটা একতরফা ছিল না । আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে আমিও চেষ্টা করতাম শ্যামলদার প্রিয় কিছু পদ রান্না করার। যত খারাপ রান্না হোক শ্যামলদার খাবারের ভিডিও দেখেও বোঝার উপায় থাকতো না, রান্নার গুণাবলি।
শ্যামলদাকে যাঁরা কিছুটা চিনতেন, তাঁরা সকলেই স্বীকার করবেন শ্যামলদা বাজার করতে ভালো বাসতেন। শ্যামলদা বাজার করার সময়ে যেমন সবজি -মাছ-মাংস-ফল-মিষ্টি ইত্যাদি কিনতেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেন বিক্রেতার হৃদয়টিও কিনে নিতেন।
শ্যামলদাকে অনুকরণ করি আমি বিভিন্ন ক্ষেত্রে, তার মধ্যে বাজার করাটা এক নম্বরে । আমি যার কাছ থেকে কাঁচালঙ্কা কিনি, তার বাড়ি কোথায় বাড়িতে কে কে আছে, সবকিছু জানা হয়ে গেছে আমার। এটা শ্যামলদার শিক্ষা । শ্যামলদার স্কুলে না পড়লে এটা সম্ভব হতো না । আমি ছাড়াও তরুণ কবি রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ও শ্যামলদার কাছে এই বিদ্যা রপ্ত করেছিল। তার পরিচয় আমরা অনেকেই পেয়েছি।

নতুন কেনা ব্রিফকেসটিতে এবার তো নজর দিতে হবে।




৫৬

শ্যামলদা যেমন আমাকে প্রভাতবন্ধু  বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শ্যামলদা সম্ভবত জানতেন না, প্রবোধবন্ধু- র অনুকরণে প্রভাতবন্ধু বানানোটা খুবই কঠিন কাজ । এখনকার প্রজন্মের লেখক কিংবা পাঠকেরা জানেন না এবং চেনেনও না প্রবোধবন্ধু অধিকারী নামক একজন বিশিষ্ট লেখককে ।তাঁরা পড়ার সুযোগ পাননি বলেই ধলেশ্বরী নামের মহান উপন্যাসটি । বাংলাভাষার একটি কালজয়ী  উপন্যাস ধলেশ্বরী। আমার বিনীত অনুরোধ এই উপন্যাসটি আপনারা পড়ুন এবং সিদ্ধান্ত নিন, আমি পাঠকদের ভুল পথে চালিত করতে চাইছি কিনা। এখন একটা নতুন প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি, তাহল কোন ওয়েবসাইট -এ পাওয়া যাবে । এর উত্তর আমার ঝুলিতে নেই । কারণ আমি এখনো হার্ডকপি তেই পড়তে জানি । সফট কপি পড়তে দক্ষ নই । এটা আমার ব্যক্তিগত  অক্ষমতা । এখানে আমি নিজেকে আপডেট করতে পারিনি । এটা উল্লেখ করা আমার কর্তব্য । আমি আমার নিজস্ব অক্ষমতাগুলিকে কখনোই আড়াল করতে চাই না ।
প্রবোধবন্ধু সম্পর্কে যে তথ্যটি এই প্রসঙ্গে জরুরি তা হল , তিনি ছিলেন সেই সময়ের আনন্দবাজারের যাত্রা -বিভাগের প্রধান ব্যক্তি। দুটি কথা জানানো আমার দায়িত্ব ।
১< তিনি এমন একজন লেখক যিনি যাত্রাশিল্পকে এবং যাত্রাশিল্পী দের শরীর থেকে  মফসসলের (প্রথম স-র পরে হস্ চিহ্ন দেওয়া গেল না ) গন্ধ মুছে দিয়েছিলেন প্রায়  একক চেষ্টায়। মহানগরীতে তখন যাত্রাশিল্প অচ্ছুত ছিল । আমরা গ্রুপ থিয়েটারের শিল্পীদের যে সম্মানের চোখে দেখতাম, যাত্রাশিল্পী দের কখনোই সেই চোখে দেখতে অভ্যস্ত  ছিলাম না । প্রবোধবন্ধুর জন্য যাত্রাশিল্পী রা নাগরিক জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল ।
২ < প্রবোধবন্ধু  অধিকারী -র প্রচেষ্টা এবং দক্ষতার জন্য  আনন্দবাজার পত্রিকা যত টাকার বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতো যাত্রাশিল্প থেকে সে পরিমাণ টাকা  অন্যকোনো শিল্প থেকে সংগ্রহ করার কথা ভাবতেও সাহস পেত না।
ঠিক এরকম পরিস্থিতির মধ্যে আমি যাত্রাপাড়া বা চিৎপুরে উপস্থিত হলাম ।
হাতে নতুন কেনা ব্রিফকেস ।
প্রথম ঢুকলাম সত্যম্বর  অপেরার ঘরে। আমি জানতাম সবথেকে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাদল হল সত্যম্বর অপেরা । আমার জানাটা সঠিক ছিল । আর একটা কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই, এই সত্যম্বর অপেরার সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির একটা পুরোনো যোগসূত্র ছিল। সেটাও আমার আগ্রহের কারণ হতে পারে ।
সত্যম্বর অপেরার অফিসঘর ছিল দোতলার একটা  ঘরে । খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। মালিক শৈলেন বাবুকে পাইনি । যিনি অফিসের দায়িত্ব সামলাতেন,তাঁর নাম বিমানবাবু, খুবই সাদাসিধে ভদ্রলোক । প্রথমেই তাঁর কাছে সারেন্ডার করে আমার উদ্দেশ্য জানালাম। বিমানবাবু সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। আমি খুশি মনে ফিরে গেলাম বাগবাজার, শ্যামলদার কাছে । সমস্তটা রিপোর্ট করলাম। শ্যামলদার কাছে বাহবা পেলাম । বললেন, চালিয়ে যা প্রভাতবন্ধু।
আমি সেদিন থেকে নিজেকে প্রভাতবন্ধু ভাবতে শুরু করে দিলাম ।




৫৭

যাত্রা পাড়ার দৈনন্দিন বিবরণ লিখে রাখা হয়নি। সেকারণে সবটা জানাতে পারছি না । সত্যম্বর অপেরার বিমানবাবুর সৌজন্যে আমার লেখা চলতে লাগলো সাবলীল ভাবে । দুটি উল্লেখ করার মতো ঘটনার কথা এখনো বেশ মনে আছে ।
একবার বাচ্চুদা বা অরুণ রায় বললেন যাত্রার রিহার্সাল  আছে একটা রাজবাড়িতে।আমি পরিচালক । জ্যোৎস্না দত্ত আর গুরুদাস ধাড়া দুজন মূল শিল্পী । এই দুজন তখন স্টার । অতএব সুযোগটা যে গ্রহণ না করাটা যে ভুল হবে , সেটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি ছিল । গাড়ি করে উত্তর কলকাতার এক ফাঁকা রাজবাড়িতে নামলাম বাচ্চুদার পেছন পেছন। দোতলার একটা বিশাল ঘরে রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে ।প্রথমেই  আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন বাচ্চুদা । কে যেন এক প্যাকেট লম্বা দামি সিগারেট এগিয়ে দিলেন। এসে গেল মিষ্টির প্লেট। আমরা তার সদ্ব্যবহার শুরু করে দিলাম।
এদিকে রিহার্সাল চলছে পুরোদমে । বাচ্চুদা এবং আমার সিগারেটের প্রতি মনোনিবেশে কোনো ঘাটতি ছিল না ।
এদিকে প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রতিটি ডায়লগ কেমন করে বলতে হবে তা দেখিয়ে দিচ্ছেন  জ্যোৎস্না দত্ত । কীভাবে বলতে হবে সহ কীভাবে চলতে হবে, তার সবটুকু শিখিয়ে দিচ্ছেন জ্যোৎস্না দত্ত । এই  মহান অভিনেত্রীর দক্ষতা দেখে আমি স্তম্ভিত । আমরা যারা গ্রুপ থিয়েটারের ভক্ত, তাদের কোনো ধারণাই নেই, যাত্রাশিল্পী দের অভিনীত দক্ষতা সম্পর্কে । সেদিন যা বুঝেছিলাম আজও তা ভুলে যাইনি। আমরা কত কম জানি,  সেই কমজানাটাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই সর্বত্র ।
এখন অকপটে বলতে কুণ্ঠিত হচ্ছি না, যে জ্যোৎস্না দত্তের সমতুল্য অভিনেত্রী একজনও নাটকের এরিনায় খুঁজে পাওয়া যাবে না ।
ফেরার পথে বাচ্চুদার কাছে জানতে চেয়েছিলাম --ডিরেক্টর আপনি আর নির্দেশ দিচ্ছেন জ্যোৎস্না দত্ত,  এটা কেমন নীতি ?
বাচ্চুদা বলেছিলেন ----জ্যোৎস্না দত্ত পঞ্চাশ বছর যাত্রার সঙ্গে যুক্ত আছেন, আর আমার পাঁচ দিনও হয়নি। তাহলে কে যোগ্যতম। আমি না জ্যোৎস্না দত্ত । এই একটি স্বীকারোক্তি তে অরুণ রায় বা বাচ্চুদার মহত্ব প্রকাশ পেয়েছিল ।
এই রিহার্সালের রিপোর্ট অমৃত পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল । সগৌরবে জানিয়ে দিই ---অমৃত পত্রিকাই প্রথম যাত্রা -রিহার্সালের রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। তা লিখেছিলাম আমি বা প্রভাতবন্ধু, প্রবোধবন্ধু নয়। এটাই শ্যামলদার অবদান ।
দ্বিতীয়টি আগামীকাল ।




৫৮

একজন মানুষের যেমন আঙুল আক্রান্ত হয়ে থাকে  ঠিক তেমনই একজন কবিতালেখকের আঙুলও আক্রান্ত হতে পারে । কবির আঙুল বলে সেই আঙুল কোনো ছাড় পায় না ।কারণ যিনি কবিতা লেখেন তিনিও একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি রোগ ব্যাধি থেকে মুক্ত নন।
এত কথা বলার অর্থ হল  আমার আঙুল আমাকে সুন্দরের দিকে  আসতে বাধা দিয়েছে।
এখন আমাকে যেতে হবে চিৎপুরের যাত্রা পাড়ার সত্যম্বর অপেরার ঘর, যেখানে আমার জন্য  অপেক্ষা করে আছেন বিমানবাবু। যিনি আমার বা প্রভাতবন্ধু -র পথপ্রদর্শক ।
ব্যাপারটা ঠিক  এমনটাই ছিল । বিমানবাবু ব্যবস্থা করে রাখতেন কবে কোথায় কার সঙ্গে দ্যাখা করতে হবে । আমি সেমতো তাঁর কাছে ঠিক সময়ে পৌঁছে যেতাম ।
এভাবেই কোনোদিন শান্তিগোপাল বা কোনোদিন বীণা দাশগুপ্তের সঙ্গে দ্যাখা হয়েছে। তো  একদিন একযাত্রাপালার প্রথম রজনি উলুবেড়িয়ায়। আমাকে যেতেই হবে। কোনো মুক্তি নেই । আমার  অফিসের সহকর্মী আমার বিশেষ বন্ধু মহম্মদ জিন্নুরের বাড়ি উলুবেড়িয়া। আমার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ রইল না । অতএব যাওয়াটা কনফার্ম  করে দিলাম ।
গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে  একটা বড়ো থালায় একটা মাত্র টাটকা রসগোল্লা । সাইজ দেখে আমি বোবা হয়ে গেলাম। অবস্থা দেখে কে যেন বলল-- এটা আর এমন কী, এতো কেজি রসগোল্লা । তিনি বুঝিয়ে দিলেন মাত্র  এক কেজি ছানা দিয়ে এই রসগোল্লা টি বানানো হয়েছে ।
এরপর আর কোনো প্রশ্ন বা সংশয় থাকার কথা নয়। ওরা তো আর জানতো না যে আমার রসগোল্লা খেলে খুব ঘুম পায়।
সেই কেজি রসগোল্লাটি ধীরেসুস্থে খাওয়ার পর পেটে যতটুকু জল ধরা সম্ভব সেটুকু জলপান করেই জিন্নুরের বাড়ি ।
পরদিন জিন্নুরের মাছভাত খেয়ে একসঙ্গে  অফিস ।বিকেলে বেশ ভালো একটা নিউজ করে জমা দিয়ে এলাম অমৃত দপ্তরে বা শ্যামলদার হাতে ।
শ্যামলদা বললেন , তোর এলেম আছে প্রভাতবন্ধু ।কোথাও যাস না ।আজ গ্রান্ডে একটা পার্টি আছে,  তোকেও যেতে হবে। পোল্ট্রি সংগঠনের প্রেসমিট।শুনেছি তুই মুরগি-বিশেষজ্ঞ।তোকে যেতেই হবে।
আসলে শ্যামলদা জানতেন যে এই প্রেসমিটে ভালো খানাপিনার ব্যবস্থা  আছে, আমাকে না নিয়ে সেখানে যেতেন না। এমনকি একারণে আমাকে কখনো হ্যান্ডলুম কখনো গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার বিশেষজ্ঞ হতে হয়েছে।কখনোই শ্যামলদার কোনো আদেশ অমান্য করিনি, কোনো অভিপ্রায় অপূর্ণ রাখিনি।
মুরগি-কেন্দ্রিক প্রেসমিট -র ঘটনার ধারাবিবরণী  আগামীকাল ।
শুভ রাত্রি ।

প্রভাত চৌধুরী

অমিতাভ প্রহরাজ



বেবীটক্





সাধ্যসাধনা বনাম সাধনাসাধ্য


তপস্যা করলে কতদূর কি পাওয়া যেতে পারে তার কোন মা-বাপ নেই। আর সেই রেকর্ডেড প্রাপ্তিগুলির লিস্টি দেখলে তার ভ্যারাইটিতে যেকোন বড় শপিং কমপ্লেক্স লজ্জা পেয়ে যাবে, গ্যারান্টি। কখনো, মাটিতে, জলে, বাতাসে, ল্যান্ড-ওয়াটার-এয়ার, মানুষ-জন্তু,জানোয়ার-দেবতা, তিনটেতেই এবং তিনটে থেকেই ডেথ প্রুফ হবার আশীর্বাদ, তার সঙ্গে ফ্রি পেয়েছিল যেকোন অস্ত্র থেকে ইনজ্যুরি-প্রুফ এবং দিন বা রাত, যেকোন টাইম ডেথপ্রুফ। (রাক্ষস হিরণ্যকশিপু মনে আছে তো? আরে পেল্লাদ মানে প্রহ্লাদের বাপ, সে পেয়েছিল বিষ্ণুর কাছ থেকে এ জিনিস। এক্কেবারে প্রথমে দুজন লেডিজ ছিল, দিতি আর অদিতি। সেই দিতির ছেলে হিরণ্যকশিপু, ভাই হিরণ্যাক্ষঃ) কখনো বছরের পর বছর তপস্যা করে পাতি তীর-ধনুক, কখনো আবার তাও নয়, শুধু তীর (আমাদের মহাভারতের মহান গান্ডু কর্ণ)। কখনো বাচ্চা হচ্ছেনা, তপস্যা করে স্পার্ম তাও দেবতাদের পেয়েছে এমনও এক্সাম্পল আছে!! মহাভারতের কুন্তী!! তাও আবার একটা ডোনার হলে হতো, তা না পাঁচ পাঁচটা ডিফারেন্ট ভি.ভি.আই.পি. ডোনার!!! সূর্যদেব, বরুন, ইন্দ্র, পবন ইত্যাদি। সাধে পাণ্ডুর রঙ পাণ্ডুর??!! কখনো আবার তপস্যা করে কিছু চাইনা, পেছনপাকা ছেলে, আই এ এস এন্ট্রান্স লেভেলের প্রশ্ন করে (নচিকেতা, যমকে)।
এই তপস্যা বর টপিকটা আরেকটু বলার আছে। শুধু জুলুমবাজি আর বিচিত্রতা নয়, একটা বিরাট দর্শনের জায়গা এর মধ্যে আছে যা শুধুমাত্র হিন্দু দেবদেবীদের প্রসঙ্গে প্রযোজ্য তা নয়। এটা কি জানা আছে? জ্বর, মানে ফিভার আর কি, কোন রোগ নয় একসময় একটা রাক্ষসের নাম ছিল!! আর ততোধিক বিচিত্র ও ব্যাঞ্জনাময় তার কাহিনী। ওই যে হিরণ্য রাজার কথা বলেছিলাম, ওর পেল্লাদ ছাড়াও আরেকটা ছেলে ছিল, সংহ্লাদ। বেচারা বাপের মার্ডার দেখে ভয়ে সমুদ্রের তলায় বাস করতো। তার ছেলের নাম পঞ্চজন। একটা শাঁখ বানিয়ে তার মধ্যে থাকতো। তাকেও মার্ডার করেছিল কৃষ্ণ, তাও একায় কুলোয়নি বরুণের হেল্প নিয়ে। স্রেফ একটা শাঁখ নেওয়ার জন্য বেমালুম পঞ্চজনকে মার্ডার করে ফেললে!!! সেই শাঁখটাই কুরুক্ষেত্রের টপ টপ শাঁখের মধ্যে টপেস্ট ব্র্যান্ডের শাঁখ, পাঞ্চজন্য।

যাকগে এই পঞ্চজনের লতায় পাতায় আত্মীয় জ্বর, একজন অসুর। সনাতন পূজা পদ্ধতিতে জ্বরএর পূজার কথা আছে। এঁর ধ্যানমন্ত্র হলো"জ্বরস্ত্রিপাদস্ত্রিশিরঃ ষড়ভুজো নবলোচনঃ"-
জ্বরের তিন পা, তিন মাথা, ছয় হাত, নয় চক্ষু।
এবার মজার কথা যুদ্ধ করতে আসা জ্বরের যে বর্ণনা রয়েছে তা অবিকল জ্বর-আক্রান্ত রোগীর দেহে যে লক্ষণ ফুটে ওঠে। সেম কেস ঊষার ক্ষেত্রে, দেবী উদয় হওয়ার সময় যে রূপের বর্ণনা তা অবিকল ঊষাকালের বর্ণনা। এবার মন দিয়ে শুনুন কি ভয়ঙ্কর গণ্ডগোলটা বাধলো।
প্রশ্ন উঠলো কোনটা আগে? জ্বর বা ঊষার রূপ প্রত্যক্ষ করে সেখান থেকে জ্বরাসুর বা ঊষাদেবীর সৃষ্টি না তার উলটো? এবং কেলো গেল আরো গভীরে। জ্ঞানের রূপ শুভ্র, মালিন্যহীন। তাহলে তপস্যার ফলে যে সরস্বতী উদ্ভূত হলেন ব্রহ্মার উরু থেকে (এ এক মহা স্ক্যান্ডাল আছে, সরস্বতী ব্রহ্মার মেয়ে কাম বৌ বোথ, গভীরে না যাওয়াই ভালো) তিনি "সর্বশুক্লা", "শশধরকরবর্ণনা", এটা আগে না জ্ঞান আগে? মানে জ্ঞান সাদা বলে সরস্বতী ফর্সা না সরস্বতী ফর্সা বলে জ্ঞান সাদা?

পশ্চিমের কেষ্টবিষ্টুরা বলেন প্রথমটা ঠিক। মানে আগে জ্বর বা জ্ঞানের কনসেপ্ট এসেছে, সেই কনসেপ্ট বলে জ্ঞান ফর্সা বা জ্বর উষ্ণ। এবার সেখান থেকে দেব দেবীর অলৌকিক রূপগুলি কল্পনা করা হয়েছে।

পূরব এটা মানতে নারাজ। এটা হলে তো বেদ অপৌরুষেয় নয়। ঈশ্বরতত্ত্ব খারিজ হয়ে যায়। এবার ঈশ্বরতত্ত্ব কোথায় টাকডুম করছে দেখুন। পুরাণে জ্বরকে"রুদ্রনিঃশ্বাসসম্ভূতঃ"বা শিবের নিশ্বাস থেকে জন্ম বলা হচ্ছে। এটি স্পেশাল, শৈব-জ্বর। কৃষ্ণ, বলরাম শৈব-জ্বর আক্রান্ত হয়েছিলেন। কৃষ্ণ মহা খচে গিয়ে জ্বরাসুরকে যেই টপকে দিতে যাচ্ছেন, এমন সময় আকাশবাণী বলে উঠলো "থামো, থামো, মেরোনা"।
কেন মেরোনা?
খুব মন দিয়ে যুক্তিটা শুনুন। জ্বর একটি শক্তি। পীড়াশক্তি। ব্যাধিশক্তি। জ্বর না থাকলে পীড়া বা কষ্ট থাকবেনা। পীড়া না থাকলে ভোগ বা উপভোগের কনসেপ্ট থাকবেনা। এবার মানুষ কর্মপ্রবণ প্রাণী। কর্ম করছে। এবং কর্মফল পাচ্ছে। কর্মফল একটা এনার্জি, যা কনভার্ট হয়ে যাচ্ছে উপভোগ অথবা পীড়ায়, কর্মের প্রকৃতি অনুযায়ী। দুটো কম্বাইন্ড হচ্ছে ভোগ। এবার কর্মফলকে ভোগে কনভার্ট হতেই হবে। নাহলে তা খরচ হবেনা, জমতে থাকবে। এবং জমতে থাকলেই সৃষ্টির নিয়ম অনুযায়ী একসময় এতটা কর্মফল জমে যাবে যে কর্মফল দিয়ে কর্ম ঘটানো যাবে, বা কর্ম আপনা থেকে ঘটবে, মানুষকে কর্ম করতে হবেনা অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য।
এবং এই স্টেজটাতো দেবত্ব!!! মানুষ দেবতা হয়ে যাবে!!!! এটা কখনোই হতে দেওয়া যায়না, দেবতাদের অস্তিত্বে সংকট এসে যাবে। তাই জ্বর দরকার। কর্মফল কনভার্ট হয়ে যাবে জ্বর না হওয়ায় বা পীড়িত না হওয়ায়, যা একটি উপভোগ। এবং উপভোগের দ্বারা কর্মফল খরচ হবে, জমবে না। আর দেবতার ইনসিকিউরিটি, মানুষ যদি দেবতা হতে শুরু করে, কেটে যাবে!!

এই স্ক্যান্ডাল কি করে রিভিল হলো শুনুন।

তখন কৃষ্ণ ভার্সেস শিব ফাইটিং হচ্ছে। রেয়ারেস্ট অফ থে রেয়ার সিচুয়েশন। ঘটনাটা কি? না, তপস্যা করে শিবের পুত্র হওয়া বাণ রাজা কৃষ্ণের নাতি অনিরুদ্ধকে কিডন্যাপ করেছে। কারণ, বাণের মেয়ে ঊষা স্বপ্নে দেখেছে ওই অনিরুদ্ধ ওর সাথে খারাপ কাজ করছে। সেই এ্যাডাল্ট স্বপ্ন থেকে লাভ এবং দিওয়ানা অনিরুদ্ধ ঊষার বেডরুমে অবধি পৌঁছে গেছে। খবর পেয়ে ঊষার ড্যাড বাণ জ্বলে উঠেছে। বাণের হাজারটা হাত, শিবের ছেলে, কার্তিকের ভাই, যা তা লেভেলের ডন। তার মেয়ের সাথে লাইন তাও বাড়িতে ঢুকে?!! বাণ জাস্ট অনিরুদ্ধকে সরিয়ে দিতে চায়, নিজের দৈত্য আর্মি ডেকেছে। অনিরুদ্ধ যে সে লেভেলের আশিক নয়, কৃষ্ণের নাতি, প্রদ্যুম্নের ছেলে, ধক বিশাল। কিছু না পেয়ে ঊষার বেডরুমের একটা দরজার খিল উপড়ে নিয়ে ফাইটিং। বত্রিশ রকম কায়দায় ফাইট হচ্ছে, ভ্রান্ত, উদভ্রান্ত, লুপ্ত, বিলুপ্ত, আপ্লুত ইত্যাদি।(শব্দগুলো লক্ষ্য করুন, এখানে এগুলোর একটারও মানে নেই কিন্তু, প্রত্যেকটা প্রপার নাউন। এগুলোর সাথে মানে যোগ হয়েছে অনেক পরে)যাকগে আল্টিমেটলি চোট্টামি করে সেন্সলেস করে গুম করে দিয়েছে বাণ। তো কৃষ্ণ এসেছে বাণকে খতম করতে আর শিব মহারাগে রেগে গিয়ে ছেলেকে বাঁচাতে এসেছে...
তখনই বায়োলজিক্যাল ওয়ার শুরু করে শিব, শৈব জ্বর দিয়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে এল এক অদ্ভূত অসুর, তিন পা, তিন মাথা, ছয় হাত, নয় চোখ। সে ঘন ঘন হাই তুলছে আর তার দেহ থেকে উষ্ণ ভাপ বেরোচ্ছে, চোখে ঘুম কিন্তু ছটফট করছে (বর্ণনাটা খেয়াল করুন)। সে এক ভল্ল ছুঁড়ে মারলো বলরামকে, বলরাম জ্বরে কাবু হলেন। কৃষ্ণ তখন রেগে জ্বরাসুরকে মারতে গেলে আকাশবাণী বারণ করে"মা বধীর্জ্বরমেনং তু, রক্ষণীয়স্তয়ানঘ", অর্থাৎ"হে অনঘ, একে মারবেননা, একে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য"। কারণটাতো বললাম একটু আগে। কৃষ্ণ বৈষ্ণব-জ্বর তৈরী করে ছেড়ে দিল। বৈষ্ণব ফিভার শৈব ফিভারকে মেরে ফাটিয়ে দিল। এবং ঘটলো দেবজগতের এক ঐতিহাসিক ঘটনা। শিব কৃষ্ণের কাছে এক রাউন্ড হেরে গেলেন!! পুরাণের টপ সিক্রেট ইনফর্মেশান এটা। এই তথ্য মানুষের কাছে আসার কথা নয়, কিন্তু কৃষ্ণর গাড়ী কাম ড্রাইভার দুটোই একসঙ্গে ছিল বিহঙ্গরাজ গরুড়, তার থেকে ইনফর্মেশন লিক করে চলে এসেছে হরিবংশপুরাণে, তারই রিপোর্ট থেকে এই কীটস্য কীট বেবির জুলিয়েন এ্যাসাঞ্জ হওয়া।
যাকগে, রুদ্রদেব মহাদেব বাঘছালের হাফপ্যান্ট পরে বিস্তর লম্ফ-ঝম্ফ করছিলেন কৃষ্ণকে চুন চুনকে মারুঙ্গা বলে, তখন এই মারপিটের মঞ্চ অর্থাৎ পৃথিবী, বসুন্ধরা বেজায় ভয় পেয়ে ব্রহ্মার কাছে ছুটলেন, এই দুই পাগলা-সি কে থামান, আমার যে হাড়গোড় ভেঙে গেল। এই স্টেজ ভেঙে গেলে ডেকরেটরকে অগাধ টাকা দিতে হবে। তো দাদু চললেন শিবের কাছে প্রথমে। ওই টাল্লুকে বোঝানো সহজ, সেন্টু দিলেই হবে। বললেন,

আপনার কি বেশী নেশা হয়ে গেছে? বাড়ির লোকজনের সঙ্গে ঘুষোঘুষি করছেন!!

কোন শালা বলে আমার নেশা হয়েছে??

আমি বলছি, ব্রহ্মা,"ন চ বুধস্যি কৃষ্ণং ত্বম আত্মানাং তু দ্বিধা কৃতম", "আপনি কি বুঝছেননা কৃষ্ণ আপনার দ্বিতীয় সত্তা?"

ব্যাস যায় কোথায়, কৃষ্ণকে জড়িয়ে "বস, মিস্টেক হয়ে গেছে, মিস্টেক, মিস্টেক, সরি" বলে মহাদেব ওখান থেকে কৈলাসের পথে, যাওয়ার পথে একটা হুঙ্কার
"কই রে নন্দি, আনোয়ার শাহ্‌ থেকে খান দশেক পুরিয়া তুলে আনিস তো, স্বপনের ঠেক থেকে আনবি, ওতে বীচি কম"।

এরপর বাণ শক্তি কাপুরের মতো মার খেল কৃষ্ণের কাছে, অনিরুদ্ধকে ট্যাংরার সাপের বিষের নেশা করিয়ে হ্যালু করে রাখা ছিল, ওকে চড়-থাপ্পড় মেরে সেন্সে এনে, হিরোইন ঊষার সাথে রিস্তানাতা করে দলবল দ্বারকায় ফিরলো, সে অন্য গল্প। এই অতিকায় ভ্যাজর ভ্যাজর করার কারণ আছে। হরিবংশপুরাণের এই ঘটনা শুনলে মনে হয়না আব্বাস মুস্তানের স্ক্রিপ্ট??

এখানে কতগুলো মারাত্মক কনসেপ্ট আছে। জ্বরের উপাখ্যান হচ্ছে প্রমান এই দেবতা মানুষ ক্লাসিফিকেশানে টিপিক্যালি পাওয়ারের ন্যাংটো প্রদর্শন। অলৌকিকত্বের উদ্ভব আর কিছু নয়, আসলে বিশাল মানব অমনিবাসকে দাবিয়ে রাখার কৌশল। জ্বর, ঊষা, অগ্নি, পবন এরা লৌকিক স্বাভাবিক জিনিস যাদেরকে আকার আকৃতি স্বভাব ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়ে জ্ঞানের নাগালের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে।

সরস্বতীর হাতে বীনা কেন? আর কিছুই না, বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চা থেকে ফোকাসটা সরিয়ে রাখা মানুষদের কাছে।

কিন্তু সব কিছুরই একটা ভালো দিক , প্রায়ই পূর্ব দিকের খুব কাছাকাছি, থাকে। অলৌকিকত্ব, এ্যাজ এ হোল একটা কনসেপ্ট। এটা ইচ্ছে করে, শখে গ্রো করেনি। এটা আসতে বাধ্য হয়েছে। কারন এমন একটা বিভাজনের কথা ভাবো যা হচ্ছে ইটারন্যাল। ভাবো আলাদাপন এর কথা। এখান থেকে জন্ম নিল গোটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ড্রাইভার, "সত্য"!!! সত্যির কনসেপ্ট আগে ছিলই না। ঠিক যেমন একসময় ছাপার অক্ষরে যা কিছু তাকে সত্যি বলে ভাবতো মানুষ। বইতে ছাপা আছে মাথার মধ্যে বাঁশবন আর পান্ডারা দলবেঁধে থাকে আর থাকে প্যান্ডোরাপাড়া, মাথার রেড-লাইট-এরিয়া। এটা কখনোই ভুল হতে পারে? একইরকম, একসময় ঘটনা এবং তথ্য মাত্রেই সত্য ধরা হতো। ভুল বললাম, সত্য নয়, বিশ্বাসযোগ্য মানা হতো। যা নেই, যা নয়, যা হয়না, তার অস্তিত্বই নেই মাথার মধ্যে। তার অস্তিত্ব গড়ে তোলার জন্য মনকে একটা ভার্জিন কাজ দেওয়া হলো, কল্পনা। কল্পনা আর মিথ্যের মধ্যে একটা সরু রেখা আছে


অমিতাভ প্রহরাজ

নীপবীথি ভৌমিক



মুক্ত গদ‍্য




ঘাস কাটার কাঁচি

  ওফ! এবার থামো। থেমে যাওয়ার রাস্তায় না হয় কিছুক্ষণের জন্য এসে দাঁড়াও ! আসলে,  সকাল হচ্ছে এবার। ভোরের জলকণা ছুঁয়ে ছুঁয়ে সূর্য শরীর যে নতুন এক পাখির ডাক রেখে যায়, তারই নাম মূলত সকাল। জানালাটা খুলে দিই এবার, অন্ধ রাত ভোরের স্নান সেরে এখন সকাল দেবগৃহে দেবারতি সাজাতে নিমগ্ন। কিছু পরিচিত পাখির ঠিক এই সময়েই ঘুম ভেঙ্গে যায়। যদিও কেউ কেউ ঊষার আলোয় স্নাত হয়ে এখন দেবগৃহে ! আর ঠিক এই সময়েই ভেসে আসে নিকট বাতাস ছুঁয়ে ঘাস কাটা কাঁচির আওয়াজ। কচ্ , কচ্, কচ্। যখন ছোটো ছিলাম তখন মায়ের কাছে শুনেছি, সবুজ তৃণেরা ঊষসীর নম্র তাপ মেখে শিশির বাতাসে স্নান সেরে নিতে খুব ভালোবাসে। তাই এই মুহূর্তে ওদের শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যায় স্নান সুগন্ধী। তারপর ভোরের কথোপকথন যখন সকালের পথ ছুঁয়ে যেতে চায়,  ঠিক তখনই আসে এক মালি কাকু। ওদের ভিজে নরম শরীরকে পরম যত্নে মুছে দিয়ে পরিচর্যা শুরু করে ওদের সেই মায়াবী কাঁচি দিয়ে। সূর্যের ক্রম বর্ধিত আলো আর কাঁচির ধারালো শব্দটা !! উফ! ওরা  কাঁদে জানো ! এতো আদর যে ওরা চায় না আর ! শুধু দু'হাত তুলে বাঁচতে চায়,  একমুঠো আকাশ দেখতে চায়, মালি কাকুর কাঁচিটা বড়ই নির্মম,  তারও অধিক নিষ্ঠুর মালি কাকু।

কচ্ কচ্ কচ্... আবার সেই শব্দ। ঘুমের দেশে যাওয়া ঘুমেরাও বুঝি আজ ভীত সন্ত্রস্ত। আসলে কিছু কিছু সময় রাতের অন্ধ রঙ'ই বোধহয় শান্তির, ভোর আর সকাল আলোর চেয়ে।

নীপবীথি ভৌমিক

জয়দীপ রায়




মুক্ত গদ‍্য




মেঘ পিয়নের চিঠি

সকাল থেকেই দেখছি আকাশটা মুখ গম্ভীর করে, বহুদিন বাদে ওকে রাগ করতে দেখলাম। কি জানি, আকাশেরও কি রাগ হয় ? আকাশের ভায়া হয়ে আসা বৃষ্টি ভাবুক পরশ যেন তারই প্রত্যুত্তর হ্যাঁ হয়। গোসা ঘরের যাপন রহস্য ভেদ সাংসারিক গোয়েন্দাদের,আমাদের মতো বিবাগী পাবলিকের নয়। তবু মানানোর চেষ্টার কোন কসুর রাখিনি। প্রশ্ন উত্তরের খেলা চলছিল বেশ দেওয়া নেওয়ার রোয়াকে দাড়িয়ে। তারই মাঝে ভুলে গেছিলাম যে নোটবুক ফলো করা যে বাকি রয়ে গেছে, সত্যি একদমই ভুলে গেছি। ওটা আমার রোজকার অভ্যেস।

তারপর মিনিট খানেক সেই রোয়াকেই পাইচারি মেঘুস্তর গোনা শেষ করে দিলাম পাড়ি সকালের ক্রিয়া কর্ম অব্যয়ের মাঝে। চোখ রাখলাম অভ্যাসের নোটবুকের
নোটবন্ধীর তালিকায় কোন নাম নেই। ব্যস বাঁচা গেছে। সারাটা দিন তাহলে *বরাচিত* সাপের মত কেলিয়ে পড়ে থাকি। না সেইটে আর হল না। একা থাকলে যা হয়। কাজের সূত্রে বর্তমানে বর্ধমান। বর্তে গেছি বলাই বাহুল্য, সেই সস্তায় পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার ফ্ল্যাট আর কি চাই হ্যাঁ এবারও চাই এক কাপ চা।

বৃষ্টির দিন হলেও কফির প্রত্যাশা করা দুর অস্থ। উপকরণটা একটু সিধিয়ে নিয়ে স্টোভ মুখী আগুনের আঁচ। উফ্ কি কফি বানিয়েছো প্রশান্ত। হ্যাঁ আমিই সেই প্রশান্ত, নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ালাম। পিঠ চাপড়ানোর লোকের এখন বড় অভাব।

খবরের কাগজ নিয়ে সদ্য কাপে চুমুক,, এই চোখ বোলাব সেই মুহূর্তে বজ্জাত নখুর হাঁক। জগতে এই নখুর মতন কিছু মানুষ যাদের কুকুরের লেজ মাফিক আচরণ কখনও সোজা হয়না। মেজাজ ভিমরি খাওয়ার উপক্রম সেইমতবস্থায় শান্তভাবেই জিজ্ঞাস্য, কি হয়েছে ভায়া ? এত্ত সকালে কীসের দরকার জানতে পারি?
অমনি ছাব্বিশ পাটি বার করে নখুর প্রত্যুত্তর আপনার লগে চিঠি আইসে দেইখ্যা নিন গে। হঠাৎ বজ্রপাত এমনই অবস্থা আমার আবার চিঠি ই-মেইলের যুগে চিঠি শব্দটা বড্ড বেমানান। অগত্যা আমারই হেতু যেতে হল সিঁড়ি ডিঙিয়ে ডাকবাক্সের নিকট। চিঠি খানা উল্টে পাল্টে দেখি আমারই নাম, স্পষ্ট বাংলায় লেখা তাতে প্রশান্ত বারিক c/o ঠিকানা বর্ধমান। উদ্বুদ্ধ কণ্ঠে ট্র্যাডিশান স্ট্যান্ডে কোন বাঙালি আমার প্রতি দয়া পরবশ তা জানতে মনটা বড্ড উৎবেল থেকে কৎবেল হয়ে উঠল। প্রত্যাশার পারদ যেন রান্নার হাঁড়ির ফ্যান উঁচিয়ে পড়ছে। প্রেরকের নাম দেখে চক্ষু চড়ক গাছে তখন, এক্কেবারে অদ্ভুত নাম মল্লারীর চিঠি। সোজা অর্থে মল্লার মানে বোঝায় মাঝি কিন্তু মল্লারী কি! সেটা আর ব্যাকারণ বই না ঘেঁটে সোজা চিঠির মূল বক্তব্যে হাজিরা দিলাম। দুটো কবিতা পাঠিয়েছে মোর ডাকবাক্সে সৌভাগ্যবশত আমিই এই পত্রিকার সম্পাদক। গর্বে যেন আমার গর্ব ভরে উঠল। কিছুটা সামলে নিয়ে সিরিয়াস সম্পাদকের মত আমিও পড়তে বসলাম প্রেরকের কবিতাটি। সত্যি বলতে কি লাইন গুলো বেলপাহাড়ির পথ ধরে কামরায় বসা রোজের প্যাসেঞ্জার পাশ দিয়ে কি যেন ফিস ফিসিয়ে বলে গেল। বাইরে অনবরত বৃষ্টির শব্দ জানলা বেয়ে বৃষ্টির ঝাপটা না আজ ভিজালাম না। আজ ছাতা হাতে নিয়ে বেরোনোও হল না। কবিতা দুটো যেন সারাদিন সঙ্গ দিল সম সঙ্গিনীর মত। প্রাপ্তি স্বীকারের ইচ্ছে জাগল। জানতে ইচ্ছে করল কবির পরিচিতি। তিনি আপনি যেই হন না কেন। লেখাটি সত্যি আমার ভালো লেগেছে। আসলে কথা বলার অভিপ্রায় জেগেছিল জাগিয়েছিল বলা বাহুল্য বৃষ্টি স্নাত দিনটা।

আবারও রবিবাসরীয় সকাল নখুর হুঙ্কার আজ আর খারাপ লাগেনা বরং ভালই লাগে পিয়ন মাফিক ডাক চিঠি আইস্যে মোর ডাকবাক্সে। এত্ত দিনে জানলাম নাম ওর আত্মজা। নামটা বেশ তো নামের মধ্যে একটা নিজস্বতা খুঁজে পেলাম। কলমের কালি ব্যস্ত অক্ষর বিন্যাসের খোঁজ জানলার কার্নিশ মরচে ধরা শিক অজান্তেই পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে। কার চিঠি পড়ছো জানোনা বুঝি। টোল গালটা ধিমে ধিমে গলায় উত্তর দিল হ্যাঁ আমিই আত্মজা ।


জয়দীপ রায় 

বর্তমানে সাহিত্য চর্চা,
(এম এ) করছি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। উত্তর কোলকাতার পাইক পাড়ায় থাকি ।কবিতা লিখতে ও পড়তে ভালবাসি। প্রিয় কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় ও জয় গোস্বামী।

পদ্মাবতী রায় চৌধুরী




মুক্ত গদ‍্য





বিশ্বাসের গন্ধ...

রূপকথার থালার মত গোল চাঁদের নিচে দাঁড়িয়ে কালো রাতের হাওয়া গায়ে এসে লাগতেই বুঝতে পারছি জীবনটা আসলে ভাঙা কাঁচের মত...আঁচড় খাওয়া,টুকরো টুকরো ৷ আনমনে টুকরোগুলি ছড়িয়ে দিয়েছি বারান্দার লাল মেঝেতে ৷ রাতে কি লাল বোঝা যায় ? বুক চলকে উঠছে যে রক্তের স্রোত...ওর রং কি ? লাল না কালো ? পৃথিবীর আসল রং সাদা-কালো ৷

মেঝেময় ছড়িয়ে আছে কুচি কুচি কাঁচ...বসন্তের অন্ধকার আর কাঁচের কুচি থেকে গড়িয়ে পড়ছে স্মৃতিজলের ছিটেফোঁটা আলো ৷ মাধ্যমিকের সময় তুমি প্রথম জানলে মানুষ চলে যায়...সবথেকে কাছের মানুষ ঠাম যেদিন রাতে লেলিহান আগুনের বিছানায় শুয়ে প্রথম বৃষ্টিধারার ট্রেন ধরেছিল ৷ তারপর আদিগঙ্গায় কত স্রোত দমবন্ধ হয়ে মরে গেল ৷
এখন মার্চ...এই বসন্তে আগের বছর হারিয়ে গেছেন সুপ্রতিমদা...শেষ যেদিন দেখা হল আমাকে রাত এগারোটা অব্দি লুচি বেলা শেখাতে শেখাতে আমার আফ্রিকার ম্যাপ দেখে ওরা স্বামী-স্ত্রী হাসছিল...ওবাড়ির বাতাসে এখনও ছড়িয়ে আছে আমাদের হাসির গুঁড়ো ৷ আগামী বসন্তে হয়ত ওবাড়ি...গাড়িবারান্দার তেরছা রোদ...আর খোলা ছাদের হাওয়া ইতিহাসে মিশে যাবে, একটা ঝকঝকে ফ্ল্যাটবাড়ি আকাশে মাথা তুলে দাঁড়াবে ৷ তবুও দেবী আর আমার মনে জেগে থাকবে মুক্ত একটা মানুষের স্মৃতির গন্ধ ৷

জীবনকে কখনও মুঠিতে লুকিয়ে রাখতে পারবে না তুমি ৷ ওকে কাঁচের বোতলে পুরে ছড়িয়ে দাও...ছেড়ে দাও স্রোতের সাথে ৷ হয়ত তিনশো একুশ বছর পরে সাগরে ভাসতে ভাসতে তোমার চিরকূট পৌঁছে যাবে প্রিয় ছায়ামানুষটার কাছে ! টাকা নয়,মেধা নয়,সংঘাত নয়...বুকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্মৃতিটুকু ছাড়া তুমি মৃত ৷ সারাজীবন লড়তে থাকা প্রিয়জন যখন স্মৃতিহারা স্হবির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে...আমি তখন মৃত্যুর গন্ধ পাই বাতাসে ৷

স্কুলের টানা বারান্দা থেকে ছিটকে পড়ছিলে তুমি উঁচু সিঁড়ি দিয়ে ৷ মাসের বিশেষ একটি সময়ে, যখন গড়িয়ে গড়িয়ে পাতালের দিকে চলে যাচ্ছিলে,গভীর কিছু ক্ষত...সিঁড়িভাঙা টাটকা রক্তের গন্ধ ছাড়া জীবন একবারও বুঝতে দেয়নি...তুমি দুর্বল হয়ে গেলে আজীবনের জন্য ৷ যে বাড়িটার খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে প্রতিবছর কোজাগরী চাঁদের সাথে গল্প করতে করতে তুমি স্পর্শ করতে প্রথম মেয়েবেলার নিষিদ্ধ রাত...বাতাসের শিহরণ...সেই বিশাল বাড়িটা যেদিন তোমার নাকের ডগায় বুট নাচিয়ে অন্য লোকের হয়ে গেল...সেই বিকেলের তালা তুমি নিজে হাতে বন্ধ করে করেছিলে...মনে পড়ে ? ও তালা তুমি আর এজীবনে খুলতে পারবে না...ওবাড়ির রং এখন কটকটে কমলা...অথচ তোমার রাতের স্বপ্নে ফিরে ফিরে আসছে ওর দেওয়ালের দুধসাদা গন্ধ...সিঁড়িতে চুনের গন্ধ...স্কুলফেরত একছুটে চারতলা পনিটেল দুলিয়ে এখনও শ্বাস টানছে সদ্যযৌবন...মামারবাড়ির রান্নাঘরে কয়লার উনুনে জ্বলন্ত গুলের গন্ধ...একলা দুপুরে মিটসেফে লুকোনো গুঁড়ো দুধের গন্ধ...লেকের জলে নিজের ছায়া দেখে লজ্জা পাওয়া স্বপ্নের গন্ধ..."মহারাণী"তে বিকেল গড়িয়ে সদ্য ফুলকো কচুরীর গন্ধ...চশমাছাড়া বৃষ্টিভেজা কলকাতার গন্ধ...ট্রামলাইন এঁকেবেঁকে চলেছে,আর প্রাগৈতিহাসিক হলুদ বইপাড়ার বুকজলের গন্ধ...কফিহাউজের সাদা অ্যাপ্রন পরা অন্য জগতের ওয়েটার আর ইনফিউশনের গন্ধ...আমার ঝাপসা চোখে ডুবুরীর মত কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে জন্মাচ্ছে অগ্নিগ্রাসীর শরীরের কবিতারা...তোমার অনায়াস দক্ষতায় ৷ বইটা এখনও থাকে আমার মাথার কাছে ৷ আমি খুলি না ওর একটাও পাতা...ধূলো ধুয়ে রোদে শুকোই আদরে...আমি দেখি তুমি চলে যাচ্ছ নতুন জীবনে আর আমার হাতে অগ্নিগ্রাসীর প্রতিটা কবিতার কালো কালো অক্ষর রোদের আগুনে পুড়ছে ...বাতাসে তখন রোদপোড়া গন্ধ ৷

প্রথম যেদিন তুই বইমেলার ভীড় সরিয়ে এগিয়ে এসে বই কিনতে কিনতে বললি...পরশু চলে যাচ্ছি...নতুন চাকরি...অবাক হচ্ছিল মন ৷ আমাদের পরিচয়ের বয়স তখন মাত্র তিন মিনিট চব্বিশ সেকেন্ড ! তাও তুই বললি...হাসলি আর বছর তিনেক যুদ্ধ করতে করতে আমার চোখের সব জল মুছতে মুছতে আমাকেও হাসালি মন থেকে ৷ আজ যখন তুইও ভুল বুঝে চলে যাচ্ছিস আমার জীবনের চোরাবালি থেকে ...আবারও মুছে যাচ্ছে লাল মেহগনি আবির ৷ বুকে রয়ে যাচ্ছে অফিসফেরত তোর পারফিউমে মেশা ঘামের গন্ধ...শ্রমের গন্ধ...তোর কবিতা আর বিশ্বাসের গন্ধ...ভালোবাসার গন্ধ ৷ গুঁড়ো কাঁচে রূপো চাঁদ আর সাদা-কালো রাত কুচি কুচি হয়ে যেতে যেতে কানেকানে বলছে ...

"যে-ভালোবাসা, আমার সামান্য সঞ্চয় এই জীবনে, তা শুধু তোমার, তোমারই।"

পদ্মাবতী রায় চৌধুরী 

সম্পাদক "সময়...23:59"সাহিত্য পত্রিকা
দীর্ঘ দশবছর ধরে লেখালেখির নানা ফর্মের চাতালে চারাগাছ বোনা আমার নেশা,বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনই চারণক্ষেত্র ৷ ঝুলিতে দেড়খানা স্নাতকোত্তর ডিগ্রীও আছে যদিও ৷ আপনারা আমার লেখা পড়ে মন্তব্য জানালে ভালো লাগবে ৷

সোমনাথ ভাদুড়ী



মুক্ত গদ‍্য




প্রথম ভালোবাসা

ছেলেটা নিজের বাড়ির ছাদে খুব করুণ মুখ করে এপার থেকে ওপার পায়চারি করছে, চোখে, মুখে বিস্তর চিন্তার রেখা, আজ যে তার ফলাফল বেরোবে...না এ ফলাফল স্কুলের পরীক্ষার নয়, এ ফলাফল জীবনের এক পরীক্ষার, ভালোবাসার পরীক্ষার। ছেলেটির প্রথম প্রেম ক্রিকেট, সেই ক্রিকেটের ক্লাব সিলেকশনের রেজাল্ট বেরোবে আজ। বন্ধু খবর নিয়ে আসবে। বাড়ির কেউ জানে না যে ছেলেটি এতটা প্রেমে পড়েছে যে, সেই ক্রিকেটের কথাই দিনরাত চিন্তা করছে। ওর বাড়ির কাউকে না জানিয়ে তার সিলেকশনে নাম দিয়েছে, কারণ তারা জানলে তো বারণ করতো। কারণ ছেলেটির এখন শিরে সংক্রান্তি। সামনে যে উচ্চমাধ্যমিক, জীবন নির্ভর করছে যার ফলাফলের ওপর সেই পরীক্ষা...ছেলেটির সেসব দিকে কোনো মাথা নেই ছেলেটি শুধু অধীর আগ্রহে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে কখন বন্ধু খবর নিয়ে ফিরবে, আর ভাবছে যদি সিলেকশন হয়ে যায় তা হলে কী ভাবে বাড়িতে না জানিয়ে নিজের প্রথম প্রেমকে সময় দেবে।

না, কেন জানাবো না? আমি তো কোনো অন্যায় করছি না..আমি পড়াশোনাও করবো, আবারর খেলাধুলাও সাথে সাথে চালিয়ে যাবো, একটার জন্য অন্যটা কেন থেমে থাকবে? একটা আমার ভালোবাসা আর অন্যটি আমার প্রয়োজনীয়তা, কর্তব্য। ভালোবাসার কাছে থাকলে আমি অক্সিজেন পাবো যা দিয়ে আরো নতুন উদ্দম পাবো নিজের পড়াশোনা ঠিক ঠাক করার, দুটোই দরকার জীবনে। এই সব নানাবিধ চিন্তা করতে করতে হঠাৎ দেখতে পেল তার বেস্ট ফ্রেন্ড রাজা তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে, ছেলেটি ছাদ থেকে ইশারা করে বন্ধুকে ওপরে আস্তে বললো, সেখানেই তার ফলাফল শুনবে সে বন্ধুর মুখ থেকে, এই মুহূর্তে ছেলেটার মনে হচ্ছে তার সারা শরীর কেমন অবশ হয়ে যাচ্ছে, যদি সে এই পরীক্ষায ফেল করে তাহলে কি হবে, সে আর ভাবতে পারছে না....এর মধ্যে রাজা ছাদে এসে হাজির..। কী রে রাজা বল কি হলো? ওই রাজা বল না.. বলছিস না কেন বল...ছেলেটা তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে কাকুতি মিনতি করতে লাগলো। রাজা তার বন্ধুর কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বললো, হয়নি তোর হয়নি। ছেলেটা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলো, কেন রে কি বললো সৰুদা?? রাজা বললো, ওদের ক্লাবের কোনো পুরনো খেলোয়াড় যে ওদের খুব ভালোবাসার সে হঠাৎ ফিরে এসেছে তাই ওদের এখন নতুন প্লেয়ার দরকার নেই....ছেলেটা সব শুনে কিছু বললো না, শুধু দু চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগলো। এরপর বেশ কিছু দিন কেটে গেল, ছেলেটা আস্তে আস্তে সামলে উঠলো, নিজেকে বোঝালো যে, যে যখন যাকে বা যেটাকে ভালোবাসে তারমানে কি সেটাকে পেতে হবে না হলে কি সেই ভালোবাসা বৃথা, ভুল, তা তো নয়, ভালোবাসা মানে তো শুধু পাওয়া নয়, ভালোবাসার কাছে থাকতে চাই তো আমি সেট অন্য ভাবেও হয়, বন্ধু হয়েও তো ভালোবাসার পাশে থাকা যায়, সেটা কি ভাবে? সে সেই ক্লাবের মাঠে যেতে লাগলো, খেলা দেখতো, বল বয় হিসেবে কাজ করতো কখনো কখনো, আর ভাবতো আমার হয়তো সেই যোগ্যতা নেই তাই আমি মাঠের মাঝে নেই, তাতে কি হলো মাঠের ধারে তো আছি, ক্রিকেট এর কাছে তো আছি, নিজের ভালোবাসার কাছে তো আছি...এই ভাবে অনেকগুলো বছর কেটে গেল। ছেলেটা ভালো চাকরি করে এখন, খেলা ধূলা থেকে অনেকদিন কোনো সম্পর্ক নেই, নিজের জীবনে খুশি...হঠাৎ একদিন তার কাছে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন...হ্যালো কে বলছেন? ওদিক থেকে ভেসে এলো একটা কথা, খেলবি? ছেলেটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো কে বলছেন? ওপর দিক থেকে উত্তর এলো পাড়ার ক্লাব থেকে সৰুদা বলছি...ছেলেটা অবাক হলো সৰুদা এতদিন বাদে!!! হা সৰুদা বলো....সব ঠিক আছে তো? সৰুদা বলতে লাগলেন প্রাথমিক কিছু সৌজন্য বিনিময়ের পর, যে দেখ ভাই খুব মুশকিলে পড়েছি, সামনের সপ্তাহে রবিবার পাশের পাড়ার ক্লাবের সাথে ম্যাচ আছে, কিন্তু একজন প্লেয়ার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে তুই তো এক কালে ক্রিকেট খেলতিস তা তুই একটু সামলে দে না ভাই ....শুনে তো ছেলেটি অবাক এতদিন বাদে ক্রিকেট তাকে ডাকছে, তার প্রথম ভালোবাসা, যখন সে সেটার কল্পনাও করেনি, তার থেকে অনেকদূরে!!! তার মাথা বলছে কি করে সে এতদিন বাদে সামলাবে, সেতো এসবের থেকে অনেকদূরে অনেকদিন হলো, কিন্তু মন বললো পারবো, কেন পারবো না? দূরে আছি ঠিক কিন্তু ভালোবাসা তো আছে, সেটাতো মরেনি মন থেকে....ভালোবাসার হাতছানি যখন একবার এসেছে তখন তাকে না আমি কিছুতেই বলবোনা, যে ভাবে হোক তাকে নিজের সবটুকু দেবার চেষ্টা করবো......উল্টো দিক থেকে কথা ভেসে এলো কি রে লাইন এ আছিস? কিছু বললি না তো? ছেলেটি আর কিছু না ভেবে রাজি হয়ে গেল সৰুদার প্রস্তাবে.....ফোন এ কথা হবার পর ছেলেটির চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো অনেক বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই সব দিনগুলো, সেই চোখের জল গুলো, বিনিদ্র রাত্রি গুলো...যাই হোক পুরোনো কথা আর ভাববো না এবার নতুন কমিটমেন্ট এর পালা....এরপর দু এক দিন কেটে গেল সবুদার সাথে রোজ কথা হয় খেলা নিয়ে, পুরোনো কথা, এটা সেটা...ভালোই কাটছে ছেলেটার, ভাবছে অফিস এ ছুটি নিতে হবে, ছুটির কথা বলতে হবে ম্যাচ এর জন্য....এর মধ্যে হঠাৎ একদিন সকালে ফোন, উল্টো দিকে সৰুদা, ছেলেটি ফোন তোলাতেই তার প্রথম কথা, ভাই আমি সরি আমি পারবো না...ছেলেটি অবাক হয়ে বললো কি হয়েছে সৰুদা? কি পারবে না? খানিক চুপ থেকে সৰুদা বললো তোকে টীমে নিতে....ছেলেটা তো অবাক কি হলো হঠাৎ করে!!!! কেন সৰুদা কি হলো? না রে টীম ম্যানেজার মানছেনা ওদের সাথে আমি আর লড়াই করতে পারছি না। এবার তারা যা বলবে আমাকে শুনতে হবে আমায় ক্ষমা করিস....ছেলেটা অবাক, কিছু বলার ভাষা নেই...সেই বহুবছর আগে পাওয়া ব্যাথাগুলো যেন আবার সে কিছুটা অনুভব করতে পারছে...সে খানিক চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললো, কেন এমন করলে সৰুদা..আমি তো ক্রিকেট থেকে দূরে চলেই গিয়েছিলাম তুমি আমাকে ডাকলে আর দুদিনে আবার তোমার মত পরিবর্তন হয়ে গেল?? কেন এমন করলে কেন? উল্টো দিক থেকে উত্তর ভেসে এলো, সরি আর কোনোদিন ফোন করবো না..কেটে গেল ফোনটা ...সত্ত্যিইই আর কোনোদিন ফোন আসেনি....ক্রিকেট তার আপনজনদেড় নিয়ে সুখে আছে...ছেলেটিও তার আপনজনদের নিয়ে সুখে আছে...কিন্তু তার প্রথম প্রেম ক্রিকেটকে কোনোদিন ভোলেনি...তার শুধু একটাই প্রার্থনা তার প্রথম প্রেম আরো বড়ো হোক তার স্বমহিমায়....কারণ ছেলেটির কাছে প্রেম মানে শুধু সবটুকু পাওয়া নয়..........অনেকখানি হারানো..........



*****

শুভঙ্কর পাল




কবিতা (সাধারণ বিভাগ)





স্পট লাইট

ফাগুন ভেজা চাঁদ , খুঁড়িয়ে চলে
ঘরের দরজায়
উদভ্রান্ত ছুটে যায় নগ্নতা
সূচনায় : সিরাজের জানু থেকে
ঢেলে দিয়েছে ভাড়াটে পাখির ডানায়
ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে
অর্ধেক সাপ ।

বেসবল লুফে নিলেও
চিরহরিৎ পাইনের সুগন্ধি
লুকিয়ে রাখবে
উলঙ্গ কবিতার কাছে ;

স্পট লাইট :৪
তখনো নুনের গন্ধ আর ঋতু রক্তে
করিডরে পরে থাকে
মৃত এক বালিকা....






অনুগল্প



আদরের হাত দুটি

তারপর গোধূলির  আকাশের দিকে চেয়ে দেখি পশ্চিম দিগন্তে ঘন কালো মেঘে কে যেন লাল আবিরের রং মেখে দিয়েছে । চৈত্র মাসে হয়তো সেটা অস্বাভাবিক নয় । কিন্তু তাই বলে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই এমন বদলে যাবে ভাবেনি মণি । মনির বয়স আন্দাজ করা মুশকিল । মুশকিল এই কারণে এ বয়সেও দাঁড়ি গোঁফ তেমন গজিয়ে ওঠেনি আর উচ্চতায় চার ফুট হবে কিনা তা নিয়েও  সন্দেহ । কিন্তু অদ্ভুত ওর মনটা । প্রকৃতির সাথে এক নিবিড় বন্ধন যেন সে অনুভব করে । ওর শিরায় শিরায় মেঘের অনুভূতি ও যেন শুনতে পায় । অবস্থা বেগতিক দেখে সবাই ঘরের দিকে ছুটে গেলেও ও খোলা মাঠ আর নদীর বুক থেকে যেন জীবনের রসদ খুঁজে নিতে চায় । কিন্তু আজকের আকাশ আর দশটা দিনের থেকে যেন আলাদা । ওকে দেখে আমার প্রায়ই মনে হত ও যেন রবি ঠাকুরের বলাই ।
          দেখতে দেখতে মেঘের গর্জন শুরু হয়ে গেলো । বিদ্যুতের ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে আসে । আর শব্দে হৃদ কম্প বেড়ে চারগুণ । কানে যেন তালা লেগে যাচ্ছে । দু একটি সাহসী ছেলে অবিনাশ বাবুর আম বাগানে ঝড় উপেক্ষা করে আম কুরোবার জন্য ব্যাস্ত । আজ আর বুকে সাহস কুলোচ্ছে না মণির । প্রকৃতির এমন রুদ্র রূপ সে আগে কখনো দেখেনি । ফেরার পথে হঠাৎ ওর চোখে এলো একটি ছাগল ছানা দলছুট হয়ে রয়ে গেছে শালবনে । ওর পা আটকে যায় । কী করবে ভেবে কুল কিনারা করতে পারেনা । এই ঝড়ে বনে প্রবেশ করা সমীচীন হবে কিনা একবার ভেবে নেয় । তাই বলে ওমন একটি ছাগল ছানার অসহায়তা সে এড়িয়ে যেতে পারেনা । সে ছুটে যায় বনের ভিতর এবং ছানাটি কোলে তুলে নিয়ে বেড়িয়ে আসার মুহূর্তেই একটি গাছের ডাল এসে ওর মাথায় আঘাত করে । কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও জ্ঞান হারায় । এদিকে প্রবল ঝড়ে মণি বাড়ি না ফেরায় বাড়ির বৃদ্ধা মা চিন্তায় পরে । ঝড় থেমে যেতেই পাড়ার ছেলেদের নিয়ে ছুটে যায় এদিক ওদিক । আকাশে তখন আধফালি চাঁদ দেখা দিয়েছে । একাকী জীবনে এই বাপ মরা ছেলেটিই ছিলো তার একমাত্র বেঁচে থাকার আশ্রয় । আর দশটা সাধারণ বালকের মতো না হলেও সে তার মায়ের নয়নের মণি । তাই উন্মাদের মতো মনির মা তার নাম ধরে ডাকতে থাকে । বনের ধার দিয়ে যাবার সময় একটা গোঙানির আওয়াজ ও ছাগলছানার ডাক শুনতে পেল । সেই অবলা জীবের গলাতেও যেন কেমন একটা আর্তস্বর । এগিয়ে যেতেই আবছা আলোয় তারা দেখতে পেল মণির মাথা ফেটে পড়ে আছে । জ্ঞান ফিরলেও সে উঠতে পারছিলো না । মণির মা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে । মায়ের কান্না ওর কানে যেতেই মণি চোখ মেলে একবার মায়ের দিকে তাকায় আর একবার কোলে আগলে রাখা ছাগল ছানার দিকে তাকায় । ওর মাথা দিয়ে দর দর করে রক্ত ঝরলেও সেদিকে ওর খেয়াল নেই ,বরং বলে ওঠে দেখেছো মা ছাগল ছানাটি একটুও আঘাত পায়নি ।আর দেখো কেমন মায়া নিয়ে আমার গালে আদর করছে । মা বুঝতে পারেনা এমন ছেলের জন্য হাসবে না কাঁদবে । ছেলেকে সে বুকে জড়িয়ে ধরে । আর ততক্ষণে মেঘ সরে গিয়ে আকাশে চাঁদ জোছনা ছড়িয়ে দিয়েছে ।


শুভঙ্কর পাল

ডঃ মীনা মুখার্জী




কবিতা (সাধারণ কবিতা)




" রাত জাগানিয়া কড়া নাড়ে"


                       (১)
ফেলে আসা দিন গুলো প্রেম সঙ্গে করে
ময়ূরাক্ষীর তীরে এখনও অপেক্ষায়৷
হয়তো বা রঙীন ফোয়ারা ছড়ায়৷
          ঝুলে পড়া সূর্য্যটা
                  গোধূলির ছায়া মাখায় জলে৷
অফুরান ক্লান্তি আর অনুতাপ ধাক্কা মারে
                   আঘাটায়,অবেলায়.........


                       (২)
   
যখন মাঝরাতে প্রতিদিন কবিতা শোনাতাম                       তোমায় .....
তখন পূর্ণিমার চাঁদ উঁকি মারতো জানলায়,
                                     হয়তো বা ঈর্ষায়......!
চন্দ্রদহনে ঠিক তখনি
             ঝপ্  করে আর একটা প্রেম
                      এলো জ্যোত্সনা মেখে
                                জোনাক ডানায় !


                        (৩)

সারাদিন নিঘুম আজকাল ,
           গোটা রাত ও মত্ত অভিসারে......
                       প্রেমের কবিতা  হাতে.......

আকাশে বিক্ষুব্ধ ঝড়  .......
                মহুল ডালে দোয়েল ফিঙ্গে......

সব ভালবাসা ছুঁড়ে—— প্রিয় !
                  কি নিষ্ঠুর না-চেনার ভান !
        


                         (৪)

উষ্ণ -বীজ উত্তাপ নিয়ে
             বাঁচার এক গঙ্গা সাধ—
অথচ সে রক্তে কত নীল বিষ......
আহা তোর দ্যুতিমাখা চোখে জল
                        —ঠিকরে বেরোয়....
আমি স্বপ্নেই ডুব দিতে চাই৷


                       (৫)

প্রতীক্ষায় স্থাণু হয়ে থাকা———
                   সে কল্পনারা
একযোগে বিদায় নিতে চায়৷

আমার ডানায় কি জীয়ন কাঠি?
           স্বপ্ন বালা
এক সকাল রোদ মেখে,
        ফিরে যা রংছুট দিনের মাঠে.......৷






অণুগল্প




"খুঁজে- ফেরা"
          
        অকুন্ঠিত শিশুর সুরেলা স্বর,বিস্মিত আমরা সাত সকালে৷
       —বিস্কুট দাও ন৷
     বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করি—
     —স্কুলে যাসনি কেন ভূত?
      —ল্যাট হ্যল্যোঁ যে৷তুমরা ঘরে থাকবেক ন৷
      —নাঃ ,বিবেলে আয়৷
      —ক্যানে দাদা?
      —দাদা ভাঙ্গা পা নিয়ে দৌড়তে পারবে না বাবা৷

     বাবা,মা ও দিদির না ফেরার দেশে যাওয়ার পর প্রায়ই এ আস্তানায় তার আর্বিভাব হয় ,দুধ-বিস্কুটের লোভে৷ইচ্ছেমত উদরপূর্তির পর বহু কষ্টে স্কুল পাঠানো হলো তাকে৷উদোম নাচন করতে করতে মিনিট কুড়ির মধ্যেই আবার আগমণ ভূতোর৷
         ক্র্যাচে ভর দিয়ে রজত দরজা খুলে আশ্রয় দেয় জ্যান্ত সরল নিষ্পাপ ভূতটিকে৷
       —চলে এলি যে?
       হঠাৎ গর্জে তাকায় দাদার দিকে ৷এক নাগাড়ে প্রশ্নরাজির তীক্ষ্ণ বাণ ছোঁড়ে সেই ক্ষুদে!
        —থাকবক নাই ইঠিঁয়ে হামি৷তুরা হমকে পাচার করবি৷মোর কিটনি বিকবি লয়?
       —ওঃ বাব্বাঃ বড্ড পাকা দেখছি তুই!
       —তা বল্ কেন চলে এলি?
       —হমকে খিচড়ি ভাল লাগেনি৷সুবাই পছরায় হমকে তুর দিদির কি হঁয়্যেছিলি?মিস বলেক—
    —হতভাগা সুবার মাথা খেলিস৷
   — তু বল তো দাদা হামি কি উয়াদের মাথা খালি?তুরা কত রকত চড়ালি তাও তো দিদি মরলি!
   
      রজতের স্মৃতির ক্যানভাসে বিভিন্ন রঙের আঁকিবুকি৷কোন্ মর্মর অরণ্যে ভূতোর পথ গেছে হারিয়ে,কোন্ বাঁকে?শরাহত পাখার সকরুণ স্পন্দন ধ্বনি স্পন্দিত বিধাতার প্রতি৷পুন্জিত আর্তনাদ মৃদুল বাতাসে রণিত রজতের গুন্জনে——
     "আজ আকাশের মনের কথা ঝরোঝরো বাজে..
      সারা প্রহর আমার বুকের মাঝে "!!!!
      উদ্ভ্রান্ত দু 'চোখে মা-বাবা-দিদির খুঁজে ফেরা কবিতা গাথা!!!




ডঃ মীনা মুখার্জী