এখন তরঙ্গ তে লেখা পাঠান প্রতিমাসের ৫ থেকে ২০ তারিখ অবধি

শীর্ষেন্দু দত্ত


অণুগল্প


শেলী ও মিলি

লমবাআআআআ প্ল্যাটফর্ম...লাস্ট ট্রেন আসেনি...দূরে চেয়ারে মেয়েটা। পাক্কা ছ'মিনিট হাঁটার পর তার কাছে পৌঁছাই।
-হ্যালো, আপনি কি লাস্ট ট্রেনের জন্য ...
মুখ ঘোরাতে দেখি শেলী!
শেলী আমার প্রেমিকা। ছিল। পঁচিশ বছর আগে। শালী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাসল।
-কাল রাতে শেলী মারা গেছে। ওকে পুড়িয়ে ফিরছি। আমি শেলী নই। ওর বোন মিলি..
লাস্ট ট্রেনটা শোঁওওও করে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ল, কিছু শুনতে পারছি না আর...


শীর্ষেন্দু দত্ত
সম্পাদক : 'নতুন শতক' ও ' মন কলম'

নূপুর সেনগুপ্ত



ছোট গল্প



ফিরে পাওয়া

ঘরে ফেরার সময় বুঝি হল। দিনান্তের আকাশ বলে, এবার এসো আমরা মিলি। সন্ধ্যা বলে - স্নিগ্ধ হও, আমার কাছে এসো, অতল স্নেহে ডুবিয়ে রাখি। সত্যিই কী বলে! 'আমি বলে মিলাই আমি, আর কিছু না চাই'। হ্যাঁ, জীবন যখন ফিরিয়ে দেয়, মনে হয় বৈকী - 'ঘরেও নহে পারেও নহে, যে জন আছে মাঝখানে' এক কৃত্রিম অধিকারের ভাবনায়, যা নিঃস্ব শূন্য, অস্তিত্বহীন অধিকার একমাত্র সাথী। হাহাকার করে ওঠে দিগন্ত।

পার্থ ভালবাসত অতসীকে। প্রথম যেদিন অতসীকে দেখে পার্থ, কোন এক অজানা কারণে ওর মনে হয়, অনেক ছোটবেলায় হারানো মায়ের ছবি যেন অতসীর মুখে জেগে আছে। পার্থর অন্যরকম অনুভূতি হয়। প্রেম শুধু নয়, গোপন এক স্নেহের পরশ লাগে। অতসী পার্থর থেকে পাঁচ বছরের ছোট। ওর স্নিগ্ধ কোমল দৃষ্টি, এবং গভীর উপস্থিতির সুবাস পার্থকে উচ্ছল করেনি কোনদিন, করেছিল ব্যাকুল। আর এই ব্যাকুলতা ভরিয়ে রাখত পার্থর প্রতি অনুক্ষণ। একদিনও অতসীকে না দেখে পার্থ থাকতে পারে না। দৃষ্টির দুরত্ব থাকলেও থাক, তবু দেখা যেন হয়। অতসী তার হৃদয় ভরা ভাললাগার অনুভূতি নিয়ে পার্থর প্রতীক্ষায়।

অতসী পার্থর প্রথম প্রেম নয়। একাধিক নারী তার জীবনে আসে। কিন্তু পার্থ প্রথম খুঁজে পায় প্রেমের অতল অনন্ত অতসীর মধ্যে। ভালবাসে, ভাললাগে। যা পূর্বে অনুভব করে নি। কেটে যায় দিন, কেটে যায় বছর। দুজনের কেউ পারে না ঘনিষ্ঠ হতে পরস্পরের। অথবা অভিভাবকের শরণাপন্ন হতে। কোথায় যেন বাধা! এমনভাবে একদিন অতসীর অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। পার্থ হৃদয় নিংড়ে সহ্য করে বেদনা। অধিকার তো ছিলই না, তাই ত্যাগের কোন ভাষা নেই। অতসী চলে যায় দূর দেশে। পার্থ একাকীত্ব বোধ করে না, সে ভাবে - আমি তো পরাজিত নই, ভালবাসায় কোন পরাজয় থাকতে পারে না, থাকতে নেই।

চাকরি পরিবর্তন করে পার্থ পৌঁছে যায় অতসীর দেশে। দেখা হয়। আবার সেই একইরকম পরিস্থিতি, উভয়ের অপেক্ষা, শুধুই নীরবতা। অতসী সংসার সামলায় মন দিয়ে। দাম্পত্যেও কোন দ্বিধা নেই। শুধু দিনান্তের একটি সময় প্রতীক্ষার ছোটো একটু অবসর চাই। পার্থ একা। জীবন কাটে। ভালবাসা, ভাললাগা। অতসীকে তো দেখতে পাচ্ছে। দিনের শেষে ঘরে ফেরে, অন্ধকার ঘরে আলো জ্বালে। অধিকারহীনতা আঁকড়ে ধরে। তবু বাঁচতে চায়, যতদিন অতসী বাঁচবে।

নূপুর সেনগুপ্ত

জয়শ্রী ঘোষ


ছোট গল্প


ফেলা

গোল্ডেন ব্রাউন  চুলে চিরুনি দিতে দিতে পূর্ণিমার মনে পড়ে যায় মায়ের কথা। গ্রিলের  ওপাশে ফুল মুন।

এই রকম কোনো এক রাত্রিতেই পূর্ণিমার জন্ম। প্রথমে দাদা তারপর তিন দিদি, মেজদি গল্প করত, রাত্রি বেলা, দাদা তখন ওপরের ঘরে পড়ছিল, নিচের বাঁ পাশের ঘরে মায়ের নাড়ী ছিড়ে গোপালপুরের আলো দেখার জন্য আমার তখন গুহা পথে ছটফটানি,  মা কাতরাচ্ছে  সঙ্গে দাইমায়ের হিমসিম, মা বলত দাইমা তোমাদের আর একটা মা। পুজো,  নবান্ন এইসব উৎসবের দিন গুলিতে ঘরের উঠানে এসে আঁচল পেতে বলত " কই গো মায়েরা দাইমা এসেছে" আমরাও মাকে ডাক দিতাম, মা দাইমা এসেছে" ওই গ্রামে দাইমায়ের কতো কতো সন্তান  । আমার মায়ের পাঁচ নম্বর সন্তান জন্ম নেবে। সবই শোনা কথা,মেজদিই গল্প গুলো বেশি করত কারণটা খুব পরিস্কার, মেজদির বুদ্ধি একটু কম ছিল, ভীষণ সাদাসিধে ও, বুঝতই না ওসব শুনে আমার কষ্ট হত, কেঁদেছি ও বহুবার। বড়দির অনুভূতি অনেক বেশি ছিল, বারবার বারণ করা সত্তেও লুকিয়ে ও বলে ফেলত আর ছোড়দির তো তখন জ্ঞানই হয়নি ঠিকমতো  তাই মেজদিই।  ছেলে না মেয়ে হবে সেই চিন্তায় অধির আগ্রহে বারান্দায় পায়চারি করছিল বাবা, দাদামশাই আর দিদিরা। দিদিদের মনে মনে আশা ছিল একটা ভাই হবে, বাবার পুত্র সন্তানের আর দাদা মশাইয়ের নাতির।

"মেয়ে হয়েছে " দাইমা দরজায় মুখ বাড়িয়ে বলায়, কোনো কথা না ভেবেই বাবা বলেছিল, যা যা কুলিতে ফেলে দিয়ে আয়। মেজদি ওপরে গিয়ে দাদাকে বলেছিল,

-দাদারে আবার বোন হয়েছে, বাবা বলছে কুলিতে ফেলে দিয়ে আসতে!

-সৌম্য তখন ক্লাস টেনে পড়ে । সেই সময়ে ক্লাস টেন মানে অনেক বড় হয়ে যাওয়া , পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে সংসারে অনেক দায়ভার । পড়ছিল, পড়া তো কতো হচ্ছিল!  মায়ের দিকে মন পড়েছিল,  মায়ের কষ্টের কথা ভাবছিল। দাদা রেগে গিয়ে ধমকদিয়ে বলেছিল । কী ? কে বলছে একথা ?

- সবাই চুপ । বাবা বুঝেছিল, যেভাবেই বলুক ওকথা বলা তার অন্যায় হয়েছ। সেই থেকে ডাক নাম ফেলা আর ভাল নাম হয়ে গেল পূর্ণিমা।

- সারাদিন চলে যায় চুলে চিরুনি দেওয়ার সময় টুকু বার করতে পারেনা পূর্ণিমা।  সূর্য লুকিয়ে পড়লে ছোটবেলায় মাথায় চিরুনি দেওয়া মানা ছিল।  কাজ নেই অবসরও নেই। বুড়ো বুড়ির সংসার আর সারা দিনের কাজের মেয়ে বর্ষা। বর্ষাই এখন পূর্ণিমার সন্তান  ছাত্রী ও। একটা ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে অনেকটা সময় কাটানোর ফলে মিস্ হওয়ার লোভ ছাড়তে পারেনি ।

-  অষ্টমঙ্গলার দিন  দাদা ফেলা বলে ডাকা  নিয়ে নাকে কান্না কেঁদে ছিল, ফেলা নামটি সেই দিনই বর জেনেছিল , সঙ্গে বাড়ির লোকেরা ফেলা বলা বন্ধ করেছিল খানিকটা হলেও  । দাদা মাঝেমধ্যে ফেলা বলে ডাকত আড়ালে । চিঠির শেষে লিখত "আমার আদরের ফেলা" । সেই পোস্ট কার্ড আর নেই ইনল্যান্ড লেটার নেই আর ফেলা বলার ও কেউ নেই। সেইসব কথা মনে পড়লে হাসি পায় । ফেলা নামটা ভীষণ মিষ্টি ভীষণ আনকমন লাগে আজকাল। ইচ্ছে করে ফেলা বলে একবার কেউ ডাকুক , একটিবার অন্তত ।

মোবাইলে দাদার ছবি সহ রিং টোনে রবি ভেসে উঠত মাঝেমধ্যেই, এখন আর সে ফোন আসে না । সব দাদার জন্য সব, রবীন্দ্রসংগীত ,স্কুল ফাইনাল,আই এ, কলেজে পড়া, স্কুলের চাকরি । আই এ পড়ি বাবা মা চায়নি ,  বিয়ের পরে কলেজ শেষ করা দাদার সাহায্য না থাকলে এগুনো অসম্ভব ছিল ।  স্বামী সেলের কর্মকর্তা, দাদার অনুরোধ কোনোদিন ফেলতে পারেনি । স্কুলে ভর্তি থেকে  শুরু করে বিয়ে, বাবার যাবতীয় কর্তব্য দাদা করেছে।

-কুলি রাস্তায় পরিণত হয়েছে বহুদিন, সেই ছোটবেলায়। এক সময় ঝকঝকে বালির তারপর কালো পিচের বাস রাস্তা

- এখন বাবার বাড়িতে পূর্ণিমাই সব চেয়ে সিনিয়র । নিউটাউনের "অনিমিখা" ফ্ল্যাটের সঙ্গে  আগেকার বাবার বাড়ির অনেক মিল। ছতলার বারান্দায় দাঁড়ালে ধু ধু রাস্তা বহু দূর। সেই সময় শুধু  এত গাড়ি ছিল না । পূর্ণিমা ছুটন্ত গাড়ির চাকায় ছেলেবেলা দেখতে পায়।

একমাত্র ছেলে সে তো সুদূর  বসটন শহরে, ছবিতে দেখা হয়। একবছর হল স্কুল থেকে অবসর নিয়েছে ।  জানুয়ারী মাস টা তার জীবনের স্মরণীয় মাস, রাখা ফেলা রাখার মাস। গ্রিলের ওপাশে হিমেল হাওয়া স্মৃতিকে নাড়িয়ে ঝাঁকিয়ে  জমিয়ে দিচ্ছে

-মাসি কঅঅফিফি রেএএডিডি এসো

-হ্যাঁ রে বর্ষা,সারে আটটা বেজে গেছে, তোকে কফি কে করতে বলল ?

-খাবার বানিয়ে  জল ঘেঁটে কেঁপে গেলাম যে মাসি,  ঠান্ডাটা দেখো!  ডিনার তো এখন দেরি আছে

-মেসো এসোসো

-পূর্ণিমার এখন সব থেকে বেশি প্রয়োজন ছিল এক মাগ কফির। বর্ষা বড় আদরের


জয়শ্রী ঘোষ 
জন্ম ১৯শে জুন১৯৭৩,মেমারি ।
বাবার রেলের ট্রান্সফারের চাকরি।
খুব ছোট্ট বেলার মেমারি স্টেশন অঞ্চল আজও চোখে ছবির মতো ভাষে।
বড় হয়ে ওঠা বর্ধমানে, বর্তমানে বর্ধমানেই।
প্রিয় বন্ধু একমাত্র কন্যা রিমঝিম। 
চারপাশের যা কিছু তাই নিয়ে লেখার চেষ্টা মাত্র যা পারিপার্শ্বিকের সাপেক্ষে নিজেকেই খুঁজে পাওয়ার জার্নি। 
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ প্রিয় ( অভিযান, ২০১৫)
 মেঘেদের বায়োপিক ( কবিতা পাক্ষিক, ২০১৭)

প্রতিমা বসু



ছোট গল্প



ভীতু

ছোটোর থেকেই ভীতু ছিলো নুরি....আসল নাম কিন্নরী ...সুন্দর ফর্সা মিষ্টি চেহারার মেয়েটি নুরি নামেই পরিচিত সকলের কাছে খুবই প্রিয়...ওকে দেখলেই বোঝা যেতো ভীষণ ভীতু ..সবসময়ই যেন ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে..অথচ সকলেই ওকে ভালোবাসে....
অন্ধকার হলেই এরওর পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়ায়...কখনও একা থাকেনা ..ওর বন্ধু সুমি জিজ্ঞেস করেছিলো ..কেন এতো ভয় পায় নুরি...ও বলেছিলো...অন্ধকারে ভূতের ভয় পায়...কখনো গল্প শুনেছিল ঠাকুরমার মুখে ..তার পর থেকেই ....সুমি বলে এসব নেই ..মনের ভুল...তবুও ভয় যায় না নুরির...
বয়স বেড়েছে এগারো বারো এখন...এখনও সমান ভীতু.....।
এ হেন সময়ে পড়তে বসতে গিয়ে সন্ধ্যায় হাতের কলমটা খাটের তলায় গড়িয়ে গেলো...
নীচু হয়ে আনতে যেতেই একটা কচি হাত কলমটাকে এগিয়ে দিলো ওর হাতে...
ওমা একটি মিষ্টি ছোট্ট ছেলে যে খাটের তলায়!! আশ্চর্য হয়ে ওকে বললো. ..তুমি কে? ...
ছেলেটি ভীষণ ভয়ের গলায় বলে...ও নাকি খিদের জ্বালায় একটা বিস্কুটের প্যাকেট চুরি করে খেতে গেছেলো..ওকে ভীষণ মেরেছে মালিক...আরও মারতো হয়তো ...ও পালিয়ে বেঁচেছে..
এখানে ওখানে লুকিয়ে থাকে তাই।।
নুরির মা এসে দেখলো পড়াশোনা না করে খাটের তলায় বসে নুরি বকবক করে চলেছে ...
বকুনি দিয়ে পড়তে বসায়....মা চলে যেতেই ছেলেটিকে বলে ...ভয় পাস না..খাবার এনে দেবো...এখানেই থাক..

চুপিচুপি ওকে নিজের খাবার থেকেই খাবার দেয়...তবুও ছেলেটির ভয় যায় না...ও দিনের আলোয় দেখা দেয় না...
নুরি এখন ভয় পায় না অন্ধকারে....কারণ ছোটুলালকে...ওই ছোটো ছেলেটিকে সাহস জোগাতে হয় যে ওকেই ..
একদিন নুরির মা লক্ষ্য করলেন খাবার নিয়ে অন্ধকারে মেয়ে যেন শোয়ার ঘরের খাটের নীচেয় কার সাথে বকবক করছে ...আলো নিয়ে এসে দেখতেই দেখে কোথাও কিছুই নেই ...শুধু নুরির হাত থেকে খাবার গুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ......
ওর মা ভয়ে চেঁচামেচি করে উঠলেন ...নুরি চলে আয় ...ও মানুষ নয় ...চলে আয় .....
নুরি বললে .....জানি তো ও ছোটুলাল মালিক মারবে বলে খিদের জ্বালায় লুকিয়ে বেড়াচ্ছে চুরি করেছিলো বলে....
মা বললেন ...ছোটুলাল তো মারা গেছিলো পাশের দোকানের মালিকের মারে অনেকদিন ....ওরে ও ভূত।
নুরি বললে ....বড্ড ভীতু তোমরা...ওর খিদে পেয়েছে বলেই না এসেছে আমার কাছে ...এখন ভূত বললে চলবে কেন?  ....

প্রতিমা বসু
পরিচিতি।।
আমার লেখা বেশ কিছু বই পাবেন আনন্দ প্রকাশনী থেকেই ..
নেটের জগতে বেশ কিছু বছর হয়ে গেলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির সংকল্পে দাঁতে দাঁত চেপেই কাজ করে চলেছি আজও...
আমার দেশের মাটি সাহিত্য গোষ্ঠী ...আমারই সৃষ্ট একটি দেশওসমাজ সংগঠন মূলক গোষ্ঠী ...এখনকার সকল প্রথিতযশা কবি ও সাহিত্যিকরা রয়েছেন সাথে ...
তাই এই সাহিত্য গ্রুপটিরও মঙ্গল কামনা করি সর্বান্তকরণে।।

অনুভব অর্ক


অনুগল্প


ফেসবুক

সাজানো বিয়ের আসর
উল্টোদিকে সেই মেয়েটি,কনের বেশে,
এ প্রান্তে আজ সেই ছেলেটি,
কয়েক বছর আগে বড়দিনুঅ সে ছিল আলাদা,
জাম্পার কিমবা জিন্স জ্যাকেট নয়। সচ্ছন্দ ছিল হাত গোটানো পাঞ্জাবীতে, ঠান্ডাও তেমন ছিলনা।
ভাল লেগেছিল সেই মেয়ের ছেলেটিকে। নিপাট হাসি টা যথেস্ট ছিল 'স্টোমাকে বাটারফ্লাই সাতারের।
পরদিন বক্সিং ডে, বাবার সাথে টিভিতে ইন্ডিয়ার টেস্ট দেখা আর ফেসবুকে চলতে থাকে খোঁজ, সেই কালো পাঞ্জবীর মানুষটার,
ফল মেলে এক বন্ধুর সৌজন্যে। শুরু হয় কথা, একে একে বন্ধুত্ব, ঘনিষ্টতা আর অতঃপর।
লাল কার্পেটের ওপর ফ্ল্যাশের ঝলকানি
আর দুজনের আজকের সন্ধ্যা।
রিমির বন্ধুরা হাসাহাসি করছিল। বলল," বাবানদা "ফেসবুককে নিমন্ত্রন করেননি?" বাবান বলল,"তোমরা সবাইতো তার প্রতিনিধি হয়েই এসেছো।



ফটোগ্রাফি

জলজীবন

The Twilight Saga

******
অনুভব অর্ক
নামঃ অনুভব দে। ডাকনামঃঅর্ক।
জন্ম ৬ ১১ ১৯৯৭। বেড়ে ওঠা ও বাসঃ জলপাইগুড়ি ইতিহাস সান্মানিক এর ছাত্র। মুল নেশা ফোটোগ্রাফি। অন্য নেশা লেখালিখি। জলপাইগুড়ি শ্যামলছায়া্র আড্ডা থেকে প্রকাশিত ই পত্রিকা 'জল্প' এর সম্পাদনার দায়িত্ব (অভিশ্রুতি রায়ের সাথে)। বর্তমানে জলপাইগুড়ি ফোটোগ্রাফিক আসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য ও সহ মুখপাত্র। রেলপথ ও রেল ব্যাবস্থা চর্চায় আগ্রহী। ভারতীয় রেলপ্রেমী সঙ্ঘের সক্রীয় সদস্য। ছবি তোলার প্রিয় বিষয়ঃ প্রকৃতি,পাখী ও প্রজাপতি। লেখায় অণুগল্প।

চন্দ্রাবলী ব্যানার্জী


গল্প : ছোট গল্প


ভগ্নাংশ

খুব ক্লান্ত লাগছে নীরাকে, আজ সাড়ে চারটে তেই বাড়ি ফিরে এলো। ফ্যানের স্পিডটা বাড়িয়ে, ব্যাগটা বিছানার একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ধপাস করে বিছানার উপর বসে পড়লো। কপালের চূর্ণ চুল গুলো ঘামে আটকে আছে কপালে। আঁচল দিয়ে কপালটা মুছে নিয়ে, উঠে গিয়ে ড্রেসিংটেবিলের আয়নাতে অনেক্ষন ধরে নিজেকে দেখলো। সত্যি কি সে আগের মতই দেখতে আছে ?
কপালের ঘেটে যাওয়া টিপটা মুছে ফেললো। আবার এসে বিছানায় বসে পড়লো।
সব কিছু এলো মেলো লাগছে, সেটা শারীরিক না মানুষিক উৎপীড়ন বুঝে উঠতে পারেনা। অভয়ের অফিস থেকে আসতে অনেক দেরী, অন্যদিন অভয় আগে ফেরে বাড়ি। নীরাই আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসেছে।
নীরা উঠে গিয়ে জানলার শার্শীর পর্দাগুলো টেনে দিলো। পড়ন্ত বেলার রোদ এসে পড়ছে ঘরের ভিতর । চেঞ্জ করতে ইছা করছে না, অন্যদিন অফিস থেকে এসেই স্নান করতে ঢুকে যায়, বাইরের সব ধুলো,নোংরা শরীরে আটকে থাকে ।কিন্তু আজ বিছানার উপর বসে আছে অলস ভাবে। অভয় বলে শুচিবাই নাকি নীরার।
আজ অফিসে কাজের চাপ একটু কম ছিল নীরার,  তাই কাজের ফাঁকে ফেসবুক করছিল  নীরা, কাজের চাপ কম থাকলে প্রায় করে নীরা । তার খুব ভালো একজন ফেসবুক বন্ধু আছে, হয়তো তার জন্য বা তার  সাথে কথা বলার জন্যই করে । খুব মায়া হয় তার ওই  বন্ধুর জন্য ।
মানুষটা প্রতিবন্ধী, ট্রেন দুর্ঘটনায় দুপা হারিয়েছে, হুইল চেয়ারটা তার সারা দুনিয়া, আর আছে এই ফেসবুক।
মানুষটা কে কোনো দিন দেখেনি নীরা,  তার নামও জানেনা, প্রফাইলে আছে একটা উড়ন্ত চিলের ছবি আর নাম আছে শঙ্খচিল। নীরা কোনোদিন জিজ্ঞাসাও করেনি তার নাম । মনে মনে ভাবে পা নেই বলেই হয়তো ওই মানুষটা উড়ন্ত চিলের ডানায় ভর করে পুরো দুনিয়া ঘুরতে চায় । হায়রে ভাগ্যের বিরম্বনা, কত অতৃপ্ত বাসনা তার !!!
নীরাও কোনো ছবি দেয়নি ফেসবুকে শুধু নামটাই দিয়েছে । নীরা সেই মানুষটিকে শঙ্খ বলেই কথা বলে । শঙ্খ অনেক দিন ধরেই একটা ছবি চাইছিল নীরার,  দেবো দেবো করেও দেওয়া হয়ে ওঠেনি নীরার। ফোনে কোনো ভালো ছবি ছিলোনা, ভর্তি হয়ে আছে অফিসের নানা রকম ডকুমেন্টসে । আজ নীরা ঠোঁটে হাল্কা করে লিপস্টিক দিয়ে খুব সুন্দর করে একটা সেলফি তুলে শঙ্খকে পাঠিয়ে ছিল । অনেক্ষন পর শঙ্খ একটাই  উত্তর দিয়েছিল, তুমি একই রকম আছো  তাথৈ, একটুও পাল্টাওনি। শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল নীরা,  কে ও, কি করে জানলো এ নাম টা  ?
এখন কেউতো এ নামে আর ডাকে না, নীরা তরিঘরি ম্যাসেজ করলো, কে তুমি ? তোমার নাম কি  ?
কিছুটা সময় পড়ে পালটা জবাবে নীরা একটা ছবি পেলো, গোলাপী ফ্রক পড়া একটা মেয়ের ছবি  ।কিছুটা ঝাপসা,  একটা গ্রুপ ছবি থেকে তোলা ছবি সেটা বোঝা যাচ্ছে। একি !!!! এতো নীরারই ছোটো বেলার ছবি ।  এটা কবে তুলেছিল নীরা ?
এটা কোথায় তোলা ? কে তুলেছিল  ?
ব্যাস্ত হয়ে নীরা আবার ম্যাসেজ করলো,
তোমার নাম কি? তোমার ছবি আমাকে পাঠাও, কোনো উত্তর এলো না,  নীরা ব্যাকুল হয়ে বার বার ম্যাসেজ করলো,  কে তুমি ? তোমার নাম কি ? তোমার ছবি পাঠাও?  যথারীতি কোনো উত্তর এলো না । কিছু মুহুর্ত পরেই ফেসবুক আইডি টা নিস্ক্রিয়  হয়ে গেলো । নীরা স্তম্ভিত হয়ে গেল। একটা প্রশ্ন তার মনে, এ কে ছিলো যে নিজেকে নীরার থেকে আড়াল করলো  ?

চন্দ্রাবলী ব্যানার্জী
কলকাতা-৬০, বেহালা

সুফিয়া নাসরিন


গল্প : ছোট গল্প



" যিশু "

মায়ের বুকের কাছে গলা জড়িয়ে শুয়ে আছে দশ বছরের ছেলেটা ৷ ডিসেম্বরের শেষ হতে চলল , বেশ ঠান্ডা পড়েছে ,  শত ছিন্ন কাঁথাটায় ঠিক মত ঠান্ডা কাটে না মা ব্যাটার ৷ ছেলেটা  বেশি ঠান্ডা লাগলে মায়ের বুকের কাছে  গুটি সুটি মেরে ঢুকে যায় ৷ মা জড়িয়ে ধরে থাকে তাকে  নিজের দেহের সমস্ত উষ্ণতাটুকু দিয়ে ৷ বাচ্চাটার  তখন আর ঠান্ডা লাগে না ৷ মায়ের তেল চিটচিটে ময়লা কাপড়ের গন্ধটাও তখন মায়ের বুকের মা মা গন্ধের কাছে হার মেনে যায় ৷  ছেলেটার বড় ভাল লাগে এই গন্ধটা  , নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে ছেলেটা ৷

     বস্তির ঝুপড়িতে যিশু নামটা বড় বেমানান ৷ তবুও পূর্ণিমা ছেলের নাম যিশু রেখেছে কারণ ওই বড়দিন না কি বলে , ওই দিনই জন্ম নিয়েছে তার এই বাপের নাম না পাওয়া  ছেলে ৷ কাজের বাড়িতে সে যিশুর জন্ম কাহিনী শুনেছে , আস্তাবলে নাকি জন্ম হয়েছিল ওই যিশুর , আর তার যিশুর জন্ম হয়েছে  বস্তির ছিটে বেড়ার ওই ঘরটাতে ৷

পূর্ণিমার জন্ম এই বস্তিতেই ৷ যে বছর বণ্যায় ভেসে গিয়েছিল বস্তিটা , সে বছর পুরো বস্তিতে কলেরা দেখা দিয়েছিল ব্যপকভাবে ৷ কলেরায় মারা যায় তার বাপ মা , সেই সময়  ৷ তারপর থেকেই জীবন যুদ্ধেই একলাই সৈনিক ছিল পূর্ণিমা ৷ দেখতে শুনতে মন্দ ছিল না ৷ ভরা যৌবনে  সেটাই কাল হল একদিন ৷ ছিটে বেড়া ভেঙে তুলে নিয়ে গেল বছর পনের ষোলোর পূর্ণিমাকে চারজন মিলে ৷ যাদের শারিরীক ক্ষুধা মেটানোর ফসল হল এই ছেলে ৷ কিন্তু মা হয়ে ছেলেকে দূরে ঠেলে সরাতে পারে নি ৷ কুমারী মা হলেও ফেলে দিতে পারে নি ছেলেটাকে ডাস্টবিনের গাদায় ৷ বরং তাকে বুকে আগলে নিজের একাকিত্ব জীবনের সম্বল করে বেঁচে আছে পূর্ণিমা ৷

বড়দিনের দিনই জন্ম হয় ছেলের , তাই সাধ করে নাম দেয় যিশু ৷ ছোট্ট যিশুকে নিয়েই পূর্ণিমার সব স্বপ্ন ৷ বস্তির কাছে সরকারি স্কুলে ভর্ত্তি করেছে ছেলেকে ৷ একটা বাড়িতে ঠিকে  কাজ করে পূর্ণিমা , তাছাড়াও ঘরের কাজ কাম সেরে সন্ধ্যাবেলায় বসে বসে বিড়ি বাঁধে , বেশ কিছু টাকা আসে হাতে ৷ এই করেই কোন রকম চালিয়ে নেয় দুটো পেট ৷

তাছাড়া স্কুল থাকলে সেখান থেকেই ছেলেটা দুপুরের খাবারটা পেয়ে যায় ৷ যেদিন যেদিন স্কুলে গোটা ডিম দেয় , লুকিয়ে পকেটে ভরে নেয় যিশু মায়ের মুখটাকে মনে করে ৷ বাড়ি ফিরে মাকে বলে তুমি খাও তো ! আমি চেয়ে দেখি ৷ মায়ের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে ছেলের ভালবাসা পেয়ে ৷ বুকের কাছে টেনে আদর করে খানিক , তারপর ডিমের অর্ধেকটা নিজের দাঁতে কামড়ে নিয়ে বাকিটা গুঁজে দেয় ছেলের মুখে ৷

"মা , কাল একটা কেক কিনে দেবে ? " ছেলের কথায় চোখ মেলে তাকায় পূর্ণিমা ৷ "দেব রে দেব , তোকে টাকা দেব বাপির দোকান থেকে একটা বাপুজি কেক কিনে নিস ৷ "
ওই কেক খাব না ৷ "বড় রাস্তার উপরে যে দোকানটা আছে সেখানে কাঁচের বাক্সোর ভিতরে  কত সুন্দর সুন্দর কেক সাজানো থাকে মা , জানো ! এবার আমি ওই রকম একটা কেক কিনতে চাই ৷"
পূর্ণিমা জানে ওই দোকানে কেক কেনার মত টাকা নেই তার কাছে কিন্তু ছেলেকে আপাতত ঘুম পাড়াবার জন্য মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয় ৷
ছেলেও বিশ্বাস করে নেয় মায়ের কথা , ঘুমিয়ে পড়ে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ৷

সকাল হতেই পূর্ণিমাকে বেড়িয়ে পড়তে হয় কাজে ৷ রাতের কথা সে ভুলেই গেছে সব ৷ ছেলের স্কুলে বড়দিনের ছুটি থাকায় তাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ঘরেতে রেখে বের হয় কাজে ৷
কাজের বাড়িতে আজ বেশ হৈ চৈ ৷ বড়দিন পালন চলছে ৷ কত আলো দিয়ে সাজিয়েছে গোটা বাড়িটা ৷ গিন্নিমা কেক বানাচ্ছে বেশ বড় সড় ৷ পূর্ণিমার মনে পড়ে যায় রাতের কথা ৷ তাই তো ! আজ ছেলের জন্য একটা কেক কিনে নিয়ে যেতে হবে ! গিন্নিমার কাছে মাইনের কিছু টাকা চাইবে ভাবছে , আর ক দিন পরই তো মাস পড়বে  , যদি আগে ভাগে দেয় !

পূর্ণিমা চেয়েছিল গিন্নিমার কাছে মাসের মাহিনেটা , কিন্তু নতুন মাস না পড়লে টাকা দেবে না সাফ জানিয়ে দিল তাকে ৷ কাজ শেষ করে খালি হাতেই ফিরে এল ঘরে সে ৷ অধীর প্রতীক্ষায় বসেছিল ছোট্ট যিশু  বাড়িতে মায়ের আসার পথ চেয়ে ৷

মা কে খালি হাতে আসতে দেখে ছোট্ট মনটা ভরে গেল একরাশ অভিমানে ৷ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকল বিছানার উপর ৷ পূর্ণিমা বুঝতে পেরে একটু আদর করে দিয়ে গেল ছেলেকে ৷ মাথার ঘন চুলে আঙুল চালিয়ে একটু পরিপাটি করে দিল ছেলের মাথাটার চুলগুলো  ৷ কপালে একটা চুমু এঁকে বলল , আজ একটা কেক কিনে দেব বাপির দোকান থেকে ৷ বুঝলি সোনা ?যিশুর মনটা মোটেই ভাল নেই , তার মন পড়ে আছে কাঁচের বাক্সটার ভিতরের কেকগুলোর প্রতি ৷ মা চলে গেল ঘরের কাজ সারতে ৷

উঁকি দিয়ে দেখে মা কাজে ব্যস্ত , পা টিপে টিপে বেড়িয়ে আসে যিশু  ঘর থেকে ৷ ছুটতে ছুটতে চলে আসে বড় রাস্তায় কেকের দোকানটার সামনে ৷ কি সুন্দর করে আলো আর কাঁচের সুন্দর সুন্দর পুতুল দিয়ে সাজিয়েছে দোকানটা ৷  কত ভীড় আজ দোকানে ৷ কেক কিনছে সবাই , কত সুন্দর তাদের জামা কাপড় ৷

নিজের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল যিশু  , মা আজ সব চেয়ে ভাল জামাটাই তাকে সকালে পরিয়ে দিয়েছে , তবু কেমন যেন পুরানো পুরানো জামাটা ৷  গায়েও বেশ আঁটো সাঁটো বসে গেছে ৷ গত বছর মায়ের কাজের বাড়ির গিন্নিমা দিয়েছিল তার ছেলের গায়ে আর হয়নি বলে ৷ খালি পা ,  এক পা এক পা করে এগিয়ে এল দোকানের সামনে , বড় বড় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকল রং  বে রঙের কেকগুলোর দিকে ৷ কোনটা ফুলের মত দেখতে , কোনটা আবার গাড়ির মত , আবার পুতুলের মত দেখতেও আছে ৷ অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে সে ৷
"আমাকে একটা কেক দেবে ? ওই ছোট্ট কেকটাই দাও না ! "হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে চায় যিশু ৷
"যা , যা এখান থেকে ৷ যতসব বস্তির ভিখারি ৷" দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল দোকান দার ৷ দোকানের সামনে একজন সুট বুট পরা লোক একটা কেক হাতের তালুর উপর নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে , কিনবে হয়ত ! যিশু দৌড়ে গিয়ে তাকে নাড়িয়ে বলল " কাকু আমাকে একটা কিনে দেবে ? " কিন্তু তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই তার হঠাৎ নাড়ানোর জন্য ভদ্রলোকটির হাত কেঁপে  ওঠে , পড়ে যায় কেকটা মাটিতে ৷ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনেরা হৈ হৈ করে ওঠে ৷ দোকানি আর নিজের রাগ সামলে পারে না ৷ কাঁচের বাক্সটার উপরে রাখা কাঁচের শো পিসটাকে হাতে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারে যিশুর দিকে ৷ মাথায় লাগে সেটা ৷ ফেটে যায় মাথা , মাথার আঘাতে কাঁচের শো পিসও ভেঙে যায় ছোট ছোট টুকরোয় , টুকরোগুলো কাঁটা তারের মত মুখে গায়ে বিঁধে যায় ছোট্ট যিশুর , রক্ত ঝড়তে থাকে কাঁচ বেঁধা জায়গাগুলো থেকে ৷ কিন্তু যিশুর সেদিকে খেয়াল নেই , মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে সে তখন রাস্তার উপর পড়ে থাকা ভেঙে যাওয়া  কেকটাকে  কুড়িয়ে নিতে ব্যস্ত।

সুফিয়া নাসরিন
আমি সুফিয়া নাসরিন ৷
বর্ধমানে জন্ম হলেও বর্তমানে হুগলীর চন্দননগরের বাসিন্দা ৷
সাম্মানিক বাংলা নিয়ে কলেজের গন্ডী পার করেই বিয়ের পিঁড়িতে বসা ৷
অতি সাধারণ গৃহবধূ , হাতা খুন্তি ধরার ফাঁকে ফাঁকে কলম নিয়ে খাতার উপর আঁকিবুকি কাটতে ভালবাসি ৷
ভালবাসি বৃষ্টিতে ভিজতে , গল্প - উপন্যাস , কবিতা পড়তে , আর হেড ফোনে গান শুনতে ৷
" অর্ধেক পৃথিবীর রোজনামচা " নামক আমার প্রথম গল্প সংকলনটি  প্রকাশ পেল  নভেম্বর মাসে বর্ধমান লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় ৷

জ্যোতির্ময় রায়


উপন্যাস (ধারাবাহিক)


এবং তারপর আমি

(প্রথম পর্ব )
নীহারিকা তোমায়

                              এক

"I love you "
কথাটা খুব ছোট্ট না  ? আচ্ছা ভালোবাসাটা কি ওতো সহজ ?
এমনি এমনি কি ভালো বাসা হয় .... চাইলেই ?
একটা space চাই ....  খোলা উৎমুক্ত একটা আকাশ ,খাঁচার পাখি মেলবে ডানা ,অবাধ ঢেউ আছড়ে পড়বে তীরে ... হিমালয় বেঁয়ে গঙ্গোত্রী নামবে ,সবুজ ফসলে ভরে যাবে মনের প্রান্তর ।
কই সেই সেই যায়গা ... "নীহারিকা " যাও তোমার নাম নীহারিকা দিলাম ।
উল্কা পাত না হয় হলো ... না হয় আমার পৃথ্বীর বুকে ক্ষত চিহ্নে প্রেম আঁকা হলো .... তাতে ক্ষতি নেই কোনো  ॥
ভালোবাসা শব্দটা সত্যি সহজ , সরল ,  বলো ?
হয়তো সহজ ,সরল রেখা একটা ... বক্ররেখা হয়ে বৃত্ত বানায় তারপর কেন্দ্রে  থাকে হিসাব ... কে কতোটা আকাশ পেল ,কে কতো টা মাটি ? চাওয়া পাওয়া এন্টি log এ ... সমাকলন  সাজায় শূন্য থেকে ইনফিনিটি... ॥
তবুও প্রেমে পরে  ,প্রেম হয়... ভালো বাসে ... ঘর সাজায় ,স্বপ্ন  সাজায় মনের ব্যালকনিতে গল্প হয় কথা ... ।
আচ্ছা নীহারিকা তুমি বলো কোন দিকে যাবো আমি ... বাম অলিন্দে  না ডান  অলিন্দে  ... কোন সেই পথ ? যে পথ এভারেস্ট এর গায়ে লিখে বেনামী চিঠি ... রক্তে চাপ বাড়ে , কিছু ... বারুদ আছে কি বলো তাতে ... আগুন ?
হৃদয় জ্বলবে ... ভালোবাসা কি পাবে  ধর্ষিত মন ... ॥

                               ( দুই)
       
" তুই কি পাগল হলি নাকি ? কি সব বলছিস ? কিছুই তো  বুঝতে পারছি না  ,সত্যি তোর মাথা গেছে ডাক্তার দেখা গিয়ে  ... ।
ঠিক বলেছো নীহারিকা মাথা গেছে হয়তো আমার ,হয়তো আমি আমি এই পৃথিবীর কেউ নই ,এই বদ্ধ খাঁচায় আমার জায়গা হবে কি ? আমি তো উড়তে চেয়েছি ,ভালো বাসতে... কাছে আসতে ,শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে যেমন বাক্য হয় আর তাতে দিয়ে কবিতা ... সমুদ্র ... পাহাড় ,নীল আকাশ
মেঘ ,বৃষ্টি ... হ্যাঁ আমি বৃষ্টিতে ভিজতে চেয়েছি আরও আমার শরীরে প্রতিটি লোম কূপ জানবে তার ছোঁয়া ,সুড়সুড়ি দেবে ,আর আমার লোম খিল খিল করে হেসে উঠবে ... ।
"বুঝলাম না কিছু  ,যা তো  আমার অনেক কাজ আছে ,তোর ভাট বোকা এবার একটু থামা please । কাল  আবার অ্যাসাইমেন্ট জমা দিতে হবে ,তোর তো সব কমপ্লিট তাই না রে ? "
" জানি তুই বুঝবি না আমার কথা ,আমার নামের সামনে যে কবি শব্দটা যুক্ত হয়ে গেছে ,কবিরা কখনো সহজ কথা কঠিন করে বলে ,আবার কখন কঠিন কথা সহজ করে বলে যে ,আমি সহজ কথা গুলো না হয় কঠিন করে বললাম।  এই কবি শব্দটা যে কতো ওজন আগে জানতাম না ,জানলে কোনো দিন কবিতা লিখতাম না ... আসলে কি জানিস আমি হয়তো লিখছি না কবিতা গুলো ,মনের মধ্যে যখন কথা জমে ,প্রশ্ন জন্মায় ,উত্তর মেলে না বেশির ভাগ সময় ... ঠিক তখনি ভূমিকম্প হয় ,ঝড় উঠে ,ডিপ্রেষণ ,শব্দ মালা বলে ভাষা দাও ,থেটিস থেকে হিমালয় জেগে উঠে তখন ,কেউ যেন লিখিয়ে নেয় কথা ,আর আমি লিখতে থাকি । আসলে যে আমি মনের কথা সবার মতো সহজ করে বলতে পরি না ,তাই কবিতা হয়ে যায় কথা ... ॥ "
"আমি যে বললাম অ্যাসাইমেন্ট লেখা হয়েছে  ? "
রোজ তো লিখছি আমি ,জীবন নিয়ে ,ব্যর্থতা নিয়ে
'আরে পাগলা seminer আছে যে ,তার ?'
"নাহ !"
আমি বলেছি না আমি এই পৃথিবী বন্দী খাঁচায় ,একটা মুক্ত আকাশ চাই ,একটা স্পেস কথা বলার ? কই সে জায়গা ? আমি তারই খোঁজ করি শুধু “



                    (তিন)

"হলো তোর ভাট বোকা ,আমাকে বিরিয়ানী খাওয়াবি কবে বল ? "
"খাওয়াবো তবে শর্ত আছে "
"কি শর্ত শুনি"
"কিছুই না শুধু তুই আমার পাশে বসে আমার সামনে খেতে হবে ,আমি তোর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবো শুধু ,আর নিজের পৃথিবীটা খুঁজবো "
"যা তো এখান থেকে ,তোর গলা টিপবো আমি ,আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার লোক আছে ,আর তোর তো আছে ডেকে নে ওকে ,ও জানলে কিন্তু... "
"জানবে জানবে কি হবে ,break up ,তা তো রোজ হয় ,আবার ঠিক হয় ,"
"বাহবা !এতো প্রেম ? "
"হম্ম ! এতো টাই ,তবে সেই জায়গাটা নেই ... একটা মুক্ত আকাশ ,একটা প্রান্তর ,একটা সমুদ্র নেই ... একটা ছক কাটা সাদা কাগজে আটকে গেছে কথা গুলো ,ভালো লাগা গুলো কিন্তু গোলাপ ফোটায় ,ভালোবাসাও আছে একটু টুকরো বরফ নীল কাঁচের গ্লাসে ভাসছে ,টাইটানিক কিন্তু এখনো ডুবে যায়নি ... অন্তরীপ খুঁজছে ... একটা প্রবাল প্রাচীর ডিঙিয়ে ॥ "
"কি যে বলিস কিছুই বুঝি না !"
"বুঝবি না ... আচ্ছা কবিরা কি সত্যিই পাগল ? সত্যি কি আবোল তাবোল বকে ? যুক্তিহীন ... নাকি আবেগে ? শুনেছি কবিরা প্রেমিক হয় ? তবে আমি কি কবি নই ? নাকি প্রেমিক নই ? ... তবে কেন চশমা খুললেই দেখি বদ্ধ খাঁচায় ইঁদুর দৌড় ... হারিয়ে যাচ্ছে ভালোবাসা রোজ ,চারিদিকে শুধু যন্ত্রনা ,কান্না আর ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি ... তার মাঝেই শুকনো গোলাপের পাপড়িতে ইতিহাস লিখছি ..... । আর হৃদয়টা জমে হিমালয় । তবে এই নয় যে ভালোবাসতে জানি না  ... ভালো তো রোজ বাসি তাকে ,রোজ প্রেমে পড়ি ,তার চোখে পৃথিবী আঁকি ... কিন্তু মুক্ত আকাশ পাই না । "
"তোর মাথা সত্যি গেছে ... । চল কাল viva আছে, পড় গিয়ে ,আমার কিছুই পড়া হয়নি ,আমাকে পড়তে হবে ,বাই টাটা "

"টাটা "



##
হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠলো প্রিয়মের ।
১১ .৩০ এই যা !অফিসে যেতে হবে তো  । আজও লেট । কালকে পেটে পড়েছিলো তো ঘুমের সঙ্গে ,স্বপ্নটাও বেশ জমে উঠেছিলো ... ।
একি  একটা অতি চেনা অথচ পুরোনো একটা নাম্বার  ,দুটো misscall ।
লাস্ট কত বছর আগে কথা হয়ে ছিলো মনে নেই হবে পাঁচ-ছয় বছর ,তারপর ইতিহাস ,কতো চেনা এই নাম্বারটা  ... অথচ আজ পুরোনো অনেক ,তবে হঠাৎ কি মনে করে বেঁচে আছি না নেই সেইটাই জানতে কি ,তবে ?
নাকি ..... ।
            

                         (চার )


"ফের বলবে কি রে তোর প্রেম কেমন চলছে ,কেমন আছে অনামিকা ,আর শ্রেয়সী এর খবর কি ,ফোন করে ? "
আর আমার সেই এক উত্তর ..." সব ভালো আছে ,শুধু পৃথিবীতে আকাশটা  নেই উড়ার মতো "
" তুই না ... সত্যিই  ,দেখ ভালো বাসা ও ভাবে হয় না ,যে কোনো এক জন কে ভালো বাসতে হয় , ও ভাবে কোনো সম্পর্ক টিকে না । তুই ডিসাই কর কাকে তুই চাস ? শ্রেয়সী নাকি অনামিকা ? শ্রেয়সী তো চলে গিয়েছিলো তোকে ছেড়ে। এখন তোর নাম হয়েছে ,অনেক পরিচিতি । আর এসে সে এসে আবার চলে যাবে না তার কোনো গ্যারান্টি কি আছে । আর অনামিকা খুব ভালো মেয়ে ,তোকে ভালো বাসে খুব । দেখ তুই কি করবি ? "
"আমি একটা নিজেস্ব পৃথিবী চাই,একটা নিজেস্ব আকাশ ,উড়বো বলে ... । "

আজ একটা ছোট্ট মেডিকিন কোম্পানীতে চাকরি করে প্রিয়ম । হঠাৎ নীহারিকার নক্ষত্র পতন হবে কে জানত ? হঠাৎ ৬ বছর পর  কি মনে করে ?
নাহ ,ফোন করেনি ঘুরে তাকে ।
একটা নিজেস্ব পৃথিবী চেয়েছিলাম ,পাইনি  ,আবার সেই এক ঘেয়েমী জীবন ,অফিস ,বাড়ি ... ট্রাম বাসে পিসে যাওয়া জীবন । নাহ আর কবিতা পায় না ,না আর জোর জবরদস্তি করে লিখে না কবিতার আজ মৃত অনুভূতির সাথে সাথে । আজ শুধু রক্ত উঠে মুখে কথার পাহাড় হিমালয় হয় ,বরফ জমে ,গঙ্গোত্রী ... ভাসিয়ে নিয়ে যায় বুক রোজ ,বৃষ্টি কিন্তু হয় না  আর ,মেঘ জমে ,জমাট কালো মেঘের আড়ালে নীহারিকা ,বা শ্রেয়সী বা অনামিকা এক একটা বিদ্যুৎ এর ঝলকানিতে হারিয়ে যায় মুখ ... । আর আমি নৌকা বানাই ফের ,আবার বেনামী চিঠি ... আর গোলাপ সিগন্যাল ……।


                 (পাঁচ )


আজ একটা সত্যি কথা বলবো তোমায় । নীহারিকা ... ও নীহারিকা ? শুনতে পাচ্ছো কি ? হয়তো না। তুমি তো অন্য পৃথিবীর মানুষ এখন । আমি ভিন দেশী তারা । তোমায় আমি ভালো হয়তো বাসি না ,প্রিয় বন্ধু যে তুমি ,সেই যে প্রেম বলে লোকে ন্যাকু ন্যাকু কথা ,এসবের উর্দ্ধে তোমার অবস্থান । এভারেস্টের চূড়ায়  টাইটানিক পোজ তোমাতে মানায়  ॥ খাঁচার পাখি আকাশ পায় ,কথা গুলো ভাষা পায় । অথচ সত্যি বলছি তোমায় ভালো বাসি না আমি  ,সেই ক্ষমতা হয়তো আমার নেই । তবে তোমার চোখে তাকিয়ে থাকতে হয়তো বারণ নেই ,তোমার শরীরের গন্ধটা গোলাপের গন্ধকে হার মানায় । তাই রহস্য আমার কাছে তোমার শরীর ,তোমার মন ,তোমার সব কিছুতেই ॥ তোমার ঘামের গন্ধে পারফিউম হতেও ইচ্ছে করে আমার । তোমার হৃদয়ে মাথা রেখে ইচ্ছে করে তোমার পাহাড়ে হেঁটে বেড়াই  । তোমার নাভি পদ্মে হয়ে ফুটতে ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে ,নদীতে সাঁতার কাটি
আমার ঘাম বৃষ্টি হয়ে যায় ... রহস্য সমাধান হয় না । দূর্বা ঘাসের সুড়সুড়িতে খিলখিল করে উঠা শরীরের বিষাক্ত লাভায় .... শেষ চিঠি লেখা । নীহারিকা তুমি থেকো ভালো আকাশে ,তুমি বলতে না  মেঘ সরিয়ে সূর্য উঠবে
উঠছে ... ঘন গাঢ় লাল রঙ্গা একটা সূর্য আমার আকাশের  বুকে ,রাতের তারারা সেই সূর্যের আড়ালে হারিয়ে যাবে একদিন ॥
রহস্য তবুও থেকে যাবে হয়তো .... । ।


(ক্রমশ)

********
চিত্রাঙ্কন
আমার জীবনের প্রথম স্কেচ ।
পেন্সিলের টানে আজ  এঁকেছি
আজ তোমায় আমি ।
তোমার চোখ আঁকতে এক আকাশ মেঘ
 লাগবে আরও ,বুঝে নিও সস্তা কিছু
সত্যি মিথ্যের থেকে কতটা তুমি দামি ?।।

********

জ‍্যোতির্ময় রায়

লোহাগঞ্জ, কুশমুন্ডি
দক্ষিণ দিনাজপুর
জন্ম - ১৯৯৬
বর্তমানে মেডিসিন নিয়ে পাঠরত
BCDA College of Pharmacy and Technology তে।

পদ্মাবতী রায় চৌধুরী


মুক্তগদ‍্য



চাঁদরাত গুনছে সময়...

আদিবাসীরা সময় গুনতে জানতো না...ঝুড়িনামা বটের নিচে চাঁদরাত গুনে গুনে সুচাঁদবুড়ি অপেক্ষা সার শেখাতো...

সারাটা রাত আলোয়-কালোয় মহাযুদ্ধের পরে যখন ঘুমঘুম নীলচে কুয়াশা রাতের কালোর চুলে আলতো করে আশা জড়িয়ে দিচ্ছে জুঁই জুঁই ভোর,আমার সে সময়ে ঘুম ভাঙতো হাজার চাঁদরাত আগে ৷ বিছানায় বালিশে ছড়িয়ে পড়তো আশমানী কাঁচভাঙা আলেয়া আর প্রথম আজানের সুর ৷ একছুটে কম্বল সরিয়ে
হূ-হূ শহুরে জঙ্গলে খোলা বারান্দা তখন ফেনার আঁচল জড়িয়ে বাসি আঁচড় ঢাকছে আলগোছে৷ ব্রাম্ভমুহূর্তের সময়ঘন্টা জড়াজড়ি শীতে শেষরাতের আদর সেরে নেয় ৷ বহু যুগান্তর আমি ভেবেছি ...আজানের রং আসমানী নীল ৷

জলন্ত রাত মোবাইলের নীলে তাকিয়ে তাকিয়ে আবার ভোর হয়ে এলো ৷ টার্কিশ কফিতে ঘন উষ্ণতার স্তর ঠান্ডা হাওয়ায় দুলছে, ফার্স্ট প্যাসেঞ্জারের জাফরি গলে যেমন শিরশিরে আদরে কেঁপে ওঠে নদী ৷ ঘুমন্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি, রাস্তার মোড়ে বাসগুমটিতে চায়ের উনুনে আগুনের ফুলকি বাতাসে মিশে যাচ্ছে...জনশূন্য রাস্তার চোখে ঘুম লেগে আছে ৷ আর সেই সুযোগে সারারাত তোমার আদরে ক্লান্ত ঘাসের বুক থেকে ঝরে যায় টুপটুপে শীত ৷

তোমার মাপে উল বুনছি,ছুঁতে চাইছি তপ্ত শীত ৷ বুকের ভিতরে জমা দুধের মত টনটন করে কবিতা ৷ টোকা মারলেই লিখে ফেলতে পারি আনমনে ৷ অথচ তোমার বুকের মাপে মায়াপশম বুনতে গেলেই বারবার ঘর পড়ে যায় আর জেগে ওঠে বড় বড় ব-দ্বীপ ৷ একসমুদ্র হিমশীতল স্রোতে দূরত্বটুকু চেটে খায় রোদ...মনে পড়ে,পাঁচটা হিমেল শীত আগে পোস্টার সাঁটানো এলোমেলো চুল তোমাকে ৷ মানুষ আর বইয়ের কালো অক্ষরের ভিড় আড়াল করে চোখের মণিতে দেখা হলে চকিতে ঘটে যায় বিস্ফোরণ ৷ সেই সব মাঠে মেলা আর বসবে না...আমাদের ঘরের তালাচাবি হারিয়েছে কবেই...একা মেহেদি হাসান গুমরে ওঠে...

"এইসব সান্ধ্য চায়ের দোকানে ক্যালিগ্রাফির
মত আত্মহত্যাপ্রবণতা,
তোমাকে বাড়ি না পেয়ে ভুলে যায়;
পৃথিবীতে চিরকাল যুদ্ধ ছিল নাকি শীতকাল ৷"

আজ আবার শূণ্য মাঠের আনাচে-কানাচে বাতাস গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ঝরছে,তোমার-আমার জলন্ত আত্মার থেকে ক-ফার্লং দূরত্বে ৷ প্রতি নিঃশব্দ মিলি সেকেন্ডে আমাদের মনে মনে দেখা হয়...রাতের শেষ মেট্রো ছুটে চলে গরম চায়ের ভাঁড়ের ধোঁয়া কেটে ৷ আমাদের বোবা মুখের দিকে চেয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে রাতভাঙা শীতল চাঁদ ৷ জন্মান্তর ধরে মুখোমুখি বসে আছি,গাঁওবুড়ো বলেছে...দশহাজার চাঁদরাত পেরোলে আমাকে ছুঁয়ে যাবে তোমার নিঃশ্বাস ৷

আমরা চাঁদরাত গুনে চলি...উষ্ণ গঙ্গায় আঙ্গুল ছোঁয়াবো বলে...আলাদা বিছানায়...একই চাঁদভাঙা রাতের নিচে৷

পদ্মাবতী রায় চৌধুরী 

সম্পাদক : "সময়...23:59"সাহিত্য পত্রিকা
দীর্ঘ দশবছর ধরে লেখালেখির নানা ফর্মের চাতালে চারাগাছ বোনা আমার নেশা,বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনই চারণক্ষেত্র ৷ ঝুলিতে দেড়খানা স্নাতকোত্তর ডিগ্রীও আছে যদিও ৷ আপনারা আমার লেখা পড়ে মন্তব্য জানালে ভালো লাগবে ৷


পৃথা রায় চৌধুরী


মুক্ত গদ‍্য



মা-য়েলিপনা

"আমাকে রোজ আপনারা কিচু দেবেন না... একটা দুটো টাকা দিয়ে যান, দাদারা দিদিরা... আমার পা কাটা গেচে, তাও নিজের কিডনির অসুকের জন্য সাহায্য চাইচি..." ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে এগিয়ে আসে ঘ্যানঘ্যানে বছর দশেকের কাটা পা। চিটচিটে হাফপ্যান্ট, আধছেঁড়া সোয়েটার। হাতের তোবড়ানো বাটি বলে ঝন ঝন ঝন ঝন...। এর ঝন পড়লো, ওর ঝন পড়লো, সাঁঝবাতিরও একখানা ঝন পড়লো। কি গর্ব, কি গর্ব, সবাই একটাকা দুটাকা ঝন, তার দশটাকা ঝন। ঘাবড়ে যাওয়া ঘ্যানঘ্যান ফের ঘ্যানঘ্যান করেই মেলাতে না মেলাতেই, ঝালমুড়ি, সাথে প্যান্ট্রির সাহেবিয়ানা, আহা সাথে ঝোড়ায় চপ-সিঙ্গাড়া-কাসুন্দি। কতো বুভুক্ষা, গাঁ গাঁ করে সর্বস্ব গিলে ফেলা। চা কফি ডিম সেদ্ধ... এই যে, কোন স্টেশন এটা? ওই তার সাথে ঢুকে পড়ে শীতেও খালি গায়ে, একমাত্র জামা দিয়ে কামরা পরিষ্কার করা কেল্টে দুটো। একটু করে ছেঁড়া ঠোঙা, ফেলা কাপ সরায়, আর এর তার বিরক্ত হাঁটু ঠোকে, "দাও না..." দুচ্ছাই নে, যাঃ, পালা, কি না কি হাত! গাব্দা গোব্দা শিশু ভোলানাথেদের শিশুসুলভ বজ্জাতি, গর্বিত মা বাবার মাথায় সর্বদা আসন পাতা। শাসন কারে কয়? মনুষ্য প্রজাতি পূর্বপুরুষদের ফিরিয়ে আনতে ইচ্ছুক। তা একদিকে ভালোই হবে, এই সব বুঝি টুঝি না টাইপ সন্ত্রাসবাদ, ইয়ে 'রাজ'নীতি, ইয়ে ওই হাড়ে দুব্বো গজানো ইঁদুর দৌড় সব ব্যাপারে, রেপ টেপ না কি যেন বলে, সে সব আবার মুছে যাবে। "কি আনন্দ, কি আনন্দ, কি আনন্দ..." যাহ বাবা, সেই এসেই পড়লো কোত্থেকে রবি দাদুকে। কাচের বাইরে অন্ধকার, ভেতরে এসি, মৃদু ঝিকঝিক, তার মধ্যে অয়... অয় আবার ঢুকে পড়েছে এক অন্ধ "হরিগুণ রাধেরাধে" ঝনঝন। পেরিয়েও গেলো। এদিকে বোঝা যায়, পৃথিবীর বহু নর পূর্বে নারী প্রজাতিকে নিরীক্ষণ করেনি। করেনি যখন ভালোই, তাদের নিয়ে কিঞ্চিৎ গবেষণা সেও শুরু করলো। কিন্তু এরা কি ভীষণ স্বার্থপর, তাদের দিকে এই এট্টুস দিস্টি দিতেই যে যার চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেয়। ইয়া বড়ো পাঠান যাচ্চে যে একই কামরায়! ব্যাটা কি অসাধারণ দেখতে, কিন্তু ভয় ভয় করলো বেশ। চারিদিকে যা সন্ত্রাসী। এদিকে ডাক পাল্টে গেছে। "গরম চা" থেকে "চায় গরম"। কানে কানে নীল দাঁতের কামড়, হাজার চলভাষ, আহা কতোশত রূপ তাদের, কতোশত রং। নিজের হাতের খানায় খুটুর খুটুর করতে করতে আর সবার হাতের গুলোয় বেশ লোভ টোভ দিতে দিতেই, "কুলি লাগেগা দিদি, কুলি লাগেগা?" “না ভাই, দুম করে বেরিয়ে পড়েছি মেয়েকে নিয়ে, মন খারাপ করেছে মা'র জন্য।” টিকিটের ব্যবস্থা... হয়ে গেছে ১ ঘন্টায়। ছুট ছুট মা’র কাছে। লাগেজ বওয়ার দরকার হয় না এখানে আসার থাকলে। স্টেশনে ড্রাইভার গোপাল দা, "জ্বর নাকি গো দিদি?"

"দেখলে মাম্মি, সকালেই বললাম তোমার ফিভার। কোনো কথা শোনো না তুমি। এবার হলো তো?..." শুরু বারো বছরের মা'র বকুনি। পাল্টা ধমক,"এই ফিভার কি? জ্বর বলতে পারিস না?"

আহ, আজ কোলে মাথা দিয়ে শুতে দেবে মা আবার, কতোদিন পরে। আর সে জানে, এই বারোর মা তখন ঠাট্টা করবে, "মাম্মি আবার বাচ্চা হয়ে গেছে..." এখানে শুধুই মেয়ে মেয়ে যাপন, দূরে অনেক মুখোশ পুড়ছে... মুখোশপোড়া গন্ধে মিশে যাচ্ছে লিট্টি-চোখা'র ঘ্রাণ...।

পৃথা রায় চৌধুরী
জীবনী -
ভারতবর্ষ, পশ্চিমবঙ্গ নিবাসী, কলকাতা শহর। জন্মস্থান ভারতবর্ষের ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ শহরে। সাহিত্য চর্চা শুরু, ছোটবেলা স্কুলে থাকতেই। প্রাণীবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ও পরিবেশ বিজ্ঞানে ডক্টরেট।এপার ওপার বাংলার বিভিন্ন প্রিন্ট পত্রিকা ও অনলাইন ওয়েবম্যাগ ও ব্লগে নিয়মিত লেখালিখি করি ২০১২ সাল থেকেই।
নিজের একক কাব্যগ্রন্থ দুটি... "মন্দ মেয়ের সেলফি" ও "জন্মান্তরে সিসিফাস"।
এ ছাড়া এপার ওপার বাংলার বিভিন্ন কবিতা সংকলনে স্থান পেয়েছে আমার কবিতা।
কিছু কাব্য সঙ্কলনের সম্পাদনা করেছি ও ক্ষেপচুরিয়াস নামক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীর মধ্যেও আছি। সহ-সম্পাদক : 'শহর' পত্রিকা
২০১৬ সালে “শব্দের মিছিল” সাহিত্য গোষ্ঠীর তরফ থেকে “আত্মার স্পন্দন” ১৪২৩ সম্মানপ্রাপ্ত হয়েছি।)