এখন তরঙ্গ তে লেখা পাঠান প্রতিমাসের ৫ থেকে ২০ তারিখ অবধি

আশির ব্রত চৌধুরী


সিরিজ কবিতা



লোককাব্য- ৮৩
*************

সারা গায়ে রক্তারক্তি চাঁদ হাতে পুরোনো ফকির
রাতের শেকল খুলে চেপে ধরে ঘরের কপাট
নিজের বুকেতে খুঁজে পাখির বুকের নীল তীর
ছুরিখান পুড়ে গেছে, ঘরে ফিরে রক্ত মাখা বাট।

সব পাতা কাটাকুটি পৃষ্ঠা জুড়ে অতীত শাবল
সে এক পুরোনো শ্লোক, লাটি হাতে নাটকে প্রবেশ
রাতের শরীর ধরে অন্ধ যেন খুঁজে নিজ দেশ
কিনারায় বাসা বাঁধে পথ হারা শালিকের দল।

কি এক অভাবে যেন, চোরাবালি চায় মৃতদেহ
পোস্টমর্টেম শেষ হলে, হাসি দিয়ে জেগে ওঠে কেহ।
দুর্ভিক্ষ বাজিয়ে আজ গান গায় সুশীল সময়
বর্শায় মস্তক গেঁথে তবু ডাকে তন্ময় তন্ময়।

পাখির পালক খুঁজে বরফের জ্বরের বিকার
নদীর জরায়ুখান আজও গায় হরিণ শিকার।



লোককাব্য - ৮২
**************

কি এমন দুঃখ নিয়ে ডুবে গেলো আকণ্ঠ ভৈরব!
ক্ষতমুখ লালা দিয়ে,  দুঃখবোধ চাপা দেয় ছাই
অনন্ত বিষাদ নিয়ে উড়ে যায় কদম বিলাস
ঘুড়িকে ডুবিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরে ঘুড়ির নাটাই।

ছায়ার আড়াল দিয়ে শিশুগন্ধ মুছে যায় জলে
অসংখ্য দিবস নিয়ে সাঁতরাই পুরোনো কপিকলে।
প্রেমিক নিভিয়ে দিয়ে সন্ধ্যের শরীরে মৃদুঘ্রাণ
দারুণ অভাব নিয়ে খেয়ে যাই কলমের গান।

অসীম শূন্যকে নিয়ে খালি গায়ে বৈরাগী দুপুর
আকাশ, দূরবীন,  আর সাগরের অজানা নূপুর।
স্রোতের যৌবন খেয়ে রাতে জাগে পুরাতন চর
তবুও কবিতা বাঁচে ধুয়ে গেলে সমস্ত অক্ষর।

জাহাজ শরীরে ভীড়ে পাঠাতনে পুরোনো শৈশব
নিজেকে জ্বালিয়ে আজ শ্মশান কুড়োয় মৃতশব।



লোককাব্য - ৮১
**************

কত যে গোপন রাখি শিরার ভেতরে অশ্রুপাত
সাপের শরীর থেকে অকালেই ঝরে বিষদাঁত
বিরহের মরাডালে ঝুলে আছে জীবন্ত সন্ন্যাস
তবুও মানুষ মরে শূন্যের গভীরে কারো শ্বাস।

জন্মের প্রহর থেকে বুকের খাঁচায় দিব্যবান
সমস্ত শরীর খেয়ে বুকে নিয়ে কাঁদি ভূমিখান
আমার যা কিছু দেনা বুকের ভেতরে সন্তরণ
কুরুক্ষেত্রে পুঁতে রাখি আমাদের সমস্ত মনন।

বাঁচার কৌশল থেকে আজও শিখি হরির পাঁচালী
বন্ধকী বিবেক ঋণ অন্ধকারে বাগানের মালি
বিনিময়ে কিছু নেই। চোখ দুটি শুধু প্রতিদান
চাঁদের পেছনে দৌড়ে নিভে গেছে শেষ আলোখান।

বাতাসে শেকড় খুঁড়ে পরগনায় অতিথি নতুন
সাংখ্যের শরীর জুড়ে প্রকৃতির ঘন লাল খুন।



লোককাব্য - ৮০
**************

গোপনে লুকানো থাকে বৃষ্টির ভেতরে অশ্রুপাত
নারীর সুগন্ধ জানে পৃথিবীতে জন্ম নেয়া রাত
নৌকোর দূরত্বে থাকে কান্নাজল বৈঠার সাঁতার
জীবন শুধুই বাঁচা দাঁড় বাই অকূল পাথার।

গন্ধ থেকে চিনে ফেলি শীতের ভেতরে গুপ্তহিম
কোথায় লুকানো থাকে স্বপ্নচূড় বকুল পলাশ
অন্ধকার গায়ে মাখে গভীরের নিখোঁজ ঠিকানা
ঘুম খেয়ে জেগে থাকে নিদ্রাহীন ঘুমের আকাশ।

হয়তো বা গোপন করে পাথরের নিরব ভেতর
ছায়ার পেছনে ঘুরে মৃতএক সাদা গুপ্তচর
চিতার আগুন খেয়ে মৃতদেহ জেগে উঠে রোজ
হারানো কাগজ জানে পরবাসী দোয়েলের খোঁজ।

কান্না বেয়ে জেগে ওঠে ফুলের ভেতরে গুপ্তবীজ
অঘুমের রক্ত খেয়ে জন্ম নেয় নীল মনসিজ।



লোককাব্য - ৭৯
**************

আকন্ঠ তৃষ্ণায় আজ মেঘগুলো থালা নিয়ে ঘুরে
খমক আকাশে ছুঁড়ে একতারা কেঁদে কেঁদে উড়ে
খরায় মৌসুম ডুবে খুঁটে খায় পাখির শ্মশান
ঘুম থেকে জেগে ওঠে প্রদীপের নীচে আলোখান।

ঘুমের বিছানা থেকে রাতগুলো তারা খুলে গুনে
রাতের চিতায় ধরে জেগে উঠে সমস্ত বিহান
মাছের শরীর বেয়ে কেঁদে উঠে কখনও সাগর
মরে যায় ফাসে ঝুলে প্রবচনে মিথ্যার বাথান।

আলোর শরীর বেয়ে মাঝরাতে অবাক সুরুজ
গুনে দেখে পৃথিবীর অবেলার দুরন্ত কিশোর
বাঁশী থেকে জন্ম নেয় পুরাতন গান একখান
কতদিন হাতে রেখে নিভে গেছে জীবনের মোড়।

জলন্ত বরফ খেয়ে আগুন নিজেই পুড়ে ছাই
হারানো পথের ধারে দুইহাতে শিমূল লাগাই।



লোককাব্য - ৭৮
**************

নক্ষত্রের চোখ গেলে চাঁদ থেকে খোয়া যায় রাত
নিজের শৈবাল খুলে বেড়ে ওঠে একাকী নির্জন
চিতার আগুন মেখে ভূমিপুত্র জেগে ওঠে কাঁদে
প্রচণ্ড রোদের তাপ অবিরল শ্রাবণ বর্ষণ।

চোখ দু' টি অন্ধ করে আকাশে উড়িয়ে দূরবীন
আঁচল নিভিয়ে দিয়ে নেমে আসে বিধবা সকাল
মরুর দূর্ভিক্ষ খেয়ে বিষবতী সাপের ছোবল
অতিকষ্টে জড়ো করে ধোঁয়া থেকে অমলিন কাল।

চিৎকার ঘুমিয়ে গেলে খুলে যায় শূন্যের কপাট
একা একা কেঁদে ওঠে সেতারের জোয়ারি নিরব
স্মৃতির পুরাণ খুলে করুণ রাতের শুকসারি
বুকের ডমরু খুলে রঙহারা কালের ভৈরব।

অসীম আনন্দ নিয়ে মরে যায় ঋতুবতী কাক
শূন্যের জমাট রক্তে গড়ে ওঠে রঙহীন প্যাঁক।




লোককাব্য - ৭৭
**************

কোথায় রেখেছি লেখা, ডাকঘর পড়ে ফেলে রোজ
চাঁদ এসে ঢেকে দেয় প্রজাপতি উড়ান বাতাস
শূন্যেতে এখনও খুঁজি বিভাবরী বিবস্র কোথায়?
জানালায় এঁকে দেয় অবরুদ্ধ চাঁদের আকাশ।

নিজেকে মানুষ করে গেঁথে ফেলি তার দু'টি চোখ
মৃত্যুকে কুড়িয়ে এনে চেটে দেখি বেঁচে আছে কি না?
নৌকার জোয়ার টানে স্রোতহীন নদীর আগামী
বাঁশীটির সুর নেই ছিদ্রপথে ঢুকে গেছে বীণা।

আকাশে অবাক পাখি। পাখির শরীরে লেখা মাছ
আগুন পোহায় এসে বরফের মৃদুমন্দ আঁচ
ক্ষুধায় পৃথিবী চায় রক্তঝরা জটায়ুর ডানা
জলের শরীরে টোপ বড়শীখান মেরুদণ্ডে টানা।

সহস্র যোনির মুদ্রা বলো দেখি দাবী আছে কার?
আবাল ফকির আমি হেরে যাই জীবনে আবার।




লোককাব্য- ৭৬
*************

শব্দের শেকলে বাঁধা হরিণীর পায়ের নূপুর
কবে যেন খোয়া গেছে গলুইয়ের নীচের আঁধার!
তবুও রাত্রিতে শুনি দরজার স্বগত উচ্চারণ
লুকানো প্রহরী খুঁজে পাথরের হৃদয়খানা কার?

কে যেন গহীন থেকে সুদূরে দাঁড়িয়ে ছাড়ে হাঁক
পরান বাজিয়ে ঘুরে যুবকের শৈশব সেতার
গোপন সোহাগে কেন ঋতুগন্ধ মুছে যায় জলে
অসীম দেনায় কাঁদে ঈশানের অনন্ত সাঁতার।

ওই যে বিনষ্ট নদী রেখে দেয় গোপন প্রবাহ
আজও কেন এঁকে রাখে নিমজ্জিত সাগরের ছবি
শ্মশান জ্বালিয়ে এসে নিজের শরীরে লিখে দাহ
প্রলাপ ঘুমিয়ে গেলে স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠে কবি।

বর্ষায় গমন বেঁধে জেটিঘাট ডুবে যায় ধীরে
দু' হাতে দোতারা খুলে, গান ভুলে তার বাঁধে মীড়ে।




লোককাব্য - ৭৫
**************

অভিমানে গড়ে উঠে অজান্তেই ঠোঁটের বদ্বীপ
মাধুকরী বেচে দিয়ে বদলে যায় ফুলের ঠিকানা
গভীর বর্ষণ থাকে আগুনের শরীরের মাঝে
কখনও পাখিই করে তীর থেকে বুকের নিশানা।

আড়াল নিভিয়ে দিয়ে তীর খেয়ে বেঁচে আছে পাখি
পৃথিবী ঘুমিয়ে গেলে অন্ধকার দাঁড়ায় একাকী
গভীর সাগরে থাকে সীমানায় প্রবল প্রাচীর
ঈশ্বরের চোখ বেয়ে কান্না থেকে নেমেছে শরীর।

অবিরাম সূর্য খেয়ে ভুলে যায় আগুনের স্বাদ
জীবন মাটিতে লেপে হাঁক ছাঁড়ে নিষাদ নিষাদ
হৃদয় বানের জলে ডুবে যায় সাঁতারু প্রবল
আকাল শরীর খেয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠে জল।

গোপনে লাগিয়ে যায় রাস্তা থেকে কুড়ানো অক্ষর
হারানো চাঁদের খোঁজে মাটি খুঁড়ে প্রমিক প্রবর।




লোককাব্য- ৭৪
*************

এ বড় বেঘোর জন্ম ফালাফালা স্রোতের জরায়ু
পৃষ্ঠা ভরে কান্না এঁকে ডুবে যায় গহীন স্বপ্নিল
কত কি করার ছিল? আঁকা ছিল স্বপ্ন জোছনাদিন
আকাশে পৃথিবী খুঁজে, মরে যায় শুধু আবাবিল।

কোথায় লুকানো থাকে পৃথিবীর কত গুপ্তধন!
মৃত্যুর দলিল থেকে নিভে গেছে নিরব নিখোঁজ
আমার সঞ্চিত ধন মগজে পিঁপড়ের অন্নকূট
আমি তো আগুন মাখি, আগুনে বরফ নিভে রোজ।

বৃত্তের ব্যাসার্ধ থেকে নিভে গেছে চলাচল পথ
মৃত্যুর কবিতা লিখে প্রজাপতি হয়ে যায় মথ
দুঃখ নিয়ে ডুবে গেছে কোন বাঁকে সাঁতারু গহীন
প্রসূতি অক্ষর থেকে ঝরে যায় দুঃখে অন্তলীন।

তবুও নেভাই রোজ বাকলের শরীরে সজল
কে আর মুছিয়ে দেবে ব্যাসের শরীরে কান্নাজল।

আশির ব্রত চৌধুরী

No comments:

Post a Comment