এখন তরঙ্গ তে লেখা পাঠান প্রতিমাসের ৫ থেকে ২০ তারিখ অবধি

প্রভাত চৌধুরী


কবিতা : সাধারণ বিভাগ


আমার কবিতা

আমি বর্ষবরণের কবিতা লিখতে চাইলে বর্ষাবরণের কবিতা
উঠে আসতে চায়, এখন চেষ্টা করত
হবে
বর্ষ এবং বর্ষার পালসরেট
একটা আ-কারের জন্য ব্যাঙেদের  আচরণে কী কী রাসায়নিক
পরিবর্তন হয় কিংবা প্রস্ফুটিত ফুলের
রং এবং গন্ধের রকমফের হয়ে থাকে তার জন্য
কোন সূর্যোদয়ে যেতে হবে তাও জানা নেই
তবু বর্ষকে তো বরণ করতেই হবে
না হলে বঁধুয়া কীকরে ঘরে ঢুকবে
শাঁখ এবং বরণডালা নিয়ে যাঁরা  অপেক্ষা করছেন
তাঁদের কথা না ভাবলে লোকে মন্দ বলবে যে

31.12.2017□ 21: 33

******

আত্মজীবনীমূলক গদ‍্য (ধারাবাহিক)



সুন্দরের দিকে

৩৩.
এই ধারাবাহিক লেখাটির নম্বর দেওয়ার ব্যাপারে সমস্যার জন্য  আমি দায়ী । প্রথম থেকেই নম্বর দেওয়া শুরু করলে কোনো সমস্যার  উদ্ভব হত না।আমি ভেবেছিলাম ছিলাম তারিখ থাকছে, সময় থাকছে, তাহলে অসুবিধা কোথায়।
আর এই লেখা কোনো টিভির সিরিয়াল নয়। আর লেখাও পরপর এগিয়ে চলছে না। 1965-র পর এসে যাচ্ছে 1969 ,  পরে আসছে 1967 , কাজেই নম্বর তাঁদের জন্য জরুরি যাঁরা পরপর পড়তে পারেননি ।
এই লেখাটি যখন পুস্তকাকারে প্রকাশিত হবে, যদি তার সম্ভাবনা থাকে, তখন  এসব নিয়ে আলোচনার সুযোগ পাবো। এখন কাজ লিখে যাওয়া । লেখাটিকে চালু রাখা।

গতকাল  অমর শচীন  অসীম ঝড়েশ্বর -দের সম্বন্ধে কথা হচ্ছিল । এই চারজনের সঙ্গে  দীপংকর দাসের নামও থাকা উচিত ছিল । দীপংকরও সরকারি  আধিকারিক । ইঞ্জিনিয়ার । আমাদের সঙ্গেই ওঠা বসা ছিল ।
আর ছিল চণ্ডী মণ্ডল সুবিমল মিশ্র -র মতো আরো কয়েকজন ।
তার আগের একটা কথা বলে রাখি,  আমাদের সাম্প্রতিক -পর্বে একটা গল্পের পত্রিকা প্রকাশিত হত, প্রায় নিয়মিত ।পাক্ষিক অথবা মাসিক। আয়তনে দু-ফর্মার মতো।কিন্ত প্রকাশ ছিল নিয়মিত।হাজরা মোড়ের স্টলেও পাওয়া যেত। আমাদের সাম্প্রতিক - এর মধ্যে চণ্ডী মণ্ডল কাননকুমার ভৌমিক দীপায়ন চৌধুরী রবীন্দু বিশ্বাস --সকলেরই গল্প প্রকাশিত হয়েছে স্বরান্তর-এ।আমিও কানন-দীপায়নের দেখাদেখি গল্প পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু ছাপা হয়নি। পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন অমল রায়চৌধুরী এবং রঞ্জিত রায়চৌধুরী ।বহু পরে  একদিন রঞ্জিত রায়চৌধুরী - কে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম সেই সময়ে আমার অক্ষম গল্প না ছাপার জন্য ।
কাননের সেইসব গল্প কোথায় হারিয়ে গেল, বই না হবার কারণে ।আমার বিশ্বাস ওই গল্পগুলি না পড়া হলে বাংলা ছোটো গল্প পাঠ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে ।
আর বই প্রকাশ কতটা জরুরি তা বুঝতে পারলাম  অমর মিত্র -র প্রথম বই মাঠ ভাঙে কালপুরুষ বইটি প্রকাশ করার সূত্রে ।অমর তখনও কলকাতার বাইরে ।বইটি প্রকাশ করতে হবে, কবিপত্র থেকে নয়।রাতারাতি তৈরি হয়ে গেল গৌরব প্রকাশনী ।ঠিকানা হল--
36 ডি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট , মানে আমার বাড়ি। অসাধারণ প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন শিল্পী প্রণবেশ মাইতি।প্রুফ দ্যাখা থেকে বই-বাঁধানো, সবটাই প্রায় একা সামলেছিলাম।
প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে হইচই শুরু গেল, রীতি মতো মাতামাতি । আমরা বুঝতে পারলাম  আমরা কারো থেকে কম নই।
তবে  এর জন্য সব কৃতিত্বটাই প্রাপ্য  অমরের, অমর মিত্র -র। আমি গায়েগতরে পরিশ্রম করেছিলাম , কিন্তু ওইসব গল্প তো অমরকেই লিখতে হয়েছিল, অমরের হয়ে অন্য কেউ এক লাইন ও লিখে দেয়নি।
আসলে লিখতে জানতে হবে, লেখার জন্য নিজেকে তৈরি করতে হবে ।যে সেটা পারবে সেই লেখক কিংবা কবি।


৩৪.
আমি দেখলাম  এই লেখাটিতে গল্পকারদের প্রাধান্য থেকেই যাচ্ছে।কবিদের সম্পর্কে বলার ব্যাপারে এত কৃপণতা কেন?
এবার কিছুটা ব্যালেন্স করা যাক ।যদিও কবিতাপাক্ষিকের কথা বলতে শুরু হলেই তখন শুধুমাত্র কবিদের কথাতেই ভরে যাবে পৃষ্ঠা।
আমাদের পাড়াতেই থাকতেন কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র । তখন তিনিই ছিলেন  প্রধানতম কবি।আমাদের হাতে লেখা পত্রিকা নবরবি-তে তিনি কী লিখেছিলেন মেজভাই দীপককুমার চৌধুরীর লেখা থেকে কোট করছি ।
'1958/59 সাল নাগাদ ।সঠিক তারিখটা আজ মনে নেই ।ঠিক হল হাতে লেখা পত্রিকা বার করা হবে ।নাম---নবরবি। প্রথম সম্পাদক বড়দা। আর সেখানেই বড়দার প্রথম কবিতার প্রকাশ ।ছাপার অক্ষরে না হলেও সেটাকে অন্যতম মাইলস্টোন হিসাবে ধরতে হবে ।সেই নবরবি-র প্রথম সংখ্যায় আশীর্বাণী চাইতে বড়দার নেতৃত্বে আমরা গিয়েছিলাম কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র -র কাছে ।তিনি নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন --'-নতুন দিনের নতুন কবি, উঠল এবার নবরবি ।
প্রেমেনদা তখন বাংলা কবিতার  অল ইন অল।। আকাশবাণীর সর্বেসর্বা ।কে কোন পুরস্কার পাবে, তা নির্ধারণ করতেন প্রমেনদা।
প্রেমেন্দ্র মিত্র -র সাগর থেকে ফেরা  একই সঙ্গে  আকাদেমি এবং রবীন্দ্র, দুটি পুরস্কারই পেয়েছিল।যার নজির কি আর আছে ।  আমি জানি  না।
আমার চোখ ফোটার পর বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া প্রেমেনদার বাড়ি যাইনি ।কারণ মনে নেই ।তবে যাইনি,  এটা বেশ মনে আছে ।একবার  আমাদের একজনের পুরস্কার পাওয়াটা কাঙ্ক্ষিত ছিল, গিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে ।এবং যথারীতি তিনি পেয়েছিলেন সেই পুরস্কার ।
দীপেনদার নির্দেশ মতো প্রেমেনদার বাড়ি গেছি পরিচয় এর জন্য কবিতা  আনতে । বেশ অনেক গেছি ।শেষের দু-একবার প্রেমেনদা ডাইরি এগিয়ে দিতেন,  আমি কপি করে নিতাম।পড়ে শোনাতাম ।শোনার পর স্বাক্ষর করে দিতেন। আমি  সেই কবিতা দীপেনদাকে জমা দিতাম।
আলোক সরকার আমাকে বলেছিলেন ---প্রেমেন্দ্র মিত্র -ই রবীন্দ্র পরবর্তী কালের প্রথম আধুনিক কবি ।
নীল নীল নীল সবুজের ছায়া কিনা তা বোঝো না, ফিকে গাঢ় হরেক রকম, কম বেশি নীল ।
এই কবিতাটি পরবর্তীতে গানও হয়েছিল ।
প্রেমেনদা সম্পর্কে একটা চালু গল্প ছিল সেসময়।প্রেমেনদা নাকি তিনবার রিকশা বদল করে বাড়ি ফিরতেন। আমি এই গল্প বিশ্বাস করি না ।বিশ্বাস করি প্রেমেন্দ্র মিত্র -র একটা গল্প পড়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় গল্প লেখা শুরু করেছিলেন । আরো একটি ঘোষণা আমি করছি ---
আমার পড়া কিশোর -পাঠ্য শ্রেষ্ঠ গল্পটির নাম --পিঁপড়ে, যেটি লিখেছিলেন কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র ।


৩৫.
গতকাল প্রেমেন্দ্র মিত্র -র মাত্র  একটি গল্পের নাম লিখেছিলাম ।লেখা হয়নি  আরো বেশ কয়েকটি গল্পের কথা। লেখা হয়নি ঘনাদার কথা । আমাদের সমসাময়িক  একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি ঘনাদার ভক্ত নন। বিজ্ঞানকে সাহিত্যে প্রয়োগ করে কিশোরদের উপযোগী করে কল্পকাহিনি রচনার শুরুটা করেছিলেন প্রেমেনদা । আমি আমি ত্রৈলোক্যনাথ কিংবা পরশুরাম -কে মাথায় রেখেই কথাটা লিখলাম । পরবর্তীতে  এই ধারাটিকে সুচারুভাবে  এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়।
জানি না  এখনকার জেনারেশনের কিশোর -কিশোরী রা ঘনাদার লেখার সঙ্গে পরিচিত কিনা ।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা ক-জন পড়ে সে-হিসেবও আমার কাছে নেই । পুস্তক -বিক্রেতারা এর হিসেব দিতে পারবে।দেজ পাবলিশিং-এর নতুন প্রজন্ম  অপু বলে দিতে পারে। তিমিরকান্তি  এই কিস্তি পড়ার পর ফিডব্যাক করলে ভালো হবে ।
এবার প্রেমেন্দ্র মিত্র থেকে আপাতত ছুটি নিয়ে যেতে চাইছি যদু ভট্টাচার্য লেনে।হাজরা রোড- কালীঘাট রোডের সংযোগস্থলের খুব কাছে ।বিখ্যাত মডেল  অয়েল মিলের গা-ঘেঁষে সরু গলি, সেই গলির একটি বাড়িতে থাকতেন কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ।বিখ্যাত কবি । মৌমাছি পেননেমে  আর একজন বিমলচন্দ্র ঘোষ ছিলেন, তিনি ভিন্ন ব্যক্তি ।কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ -এর কবিতা দিয়ে শুরু হত বাংলাভাষার সর্বাধিক প্রচারিত সাহিত্য  পত্রিকা নবকল্লোল-এ।শুধু তাই নয় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রদত্ত পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি । এক সময়ে  এষা নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা ও বের করতেন ।ওই পত্রিকার প্রচ্ছদ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। বহু বাংলা সিনেমায় ওনার কবিতা গান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে । আমার শাপমোচন -এর কথা মনে পড়ে ।
এই কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ ছিলেন আমার প্রতিবেশী । আমাকে ভাগ্যবান ভাবাটা অন্যায় হবে না ।ওনার সান্নিধ্য  আমাকে সমৃদ্ধ করেছিল।
যখন ধ্বংসকালীন কবিতা আন্দোলন শুরু করলাম , সাম্প্রতিক হাতে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম পবিত্রদার সঙ্গে । উনি পত্রিকাটি পড়ার পর বাপ-মা তুলে যে ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন, তা এখানে লেখার সাহস আমার নেই । ওনাকে  আমি দোষ দিতে পারছি না, উনি ওনার  আদর্শ  এবং বিশ্বাস থেকে যা বলেছিলেন তাকে  এখন আমি অস্বীকার করতে পারি না ।বরং অগ্রজ কবি হিসেবে উনি ওনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন । তখন খুবই খারাপ লেগেছিল ।প্রকাশও করেছিলাম ।
চেতলায় থাকতেন কবি দিনেশ দাশ।কাস্তেকবি নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন কাস্তে কবিতাটি লেখার পর। দিনেশ দাশ ছিলেন আমাদের বন্ধু শান্তনু -র বাবা।
কাস্তে কবিতাটি পড়েননি কিংবা শোনেন নি  এমন বাঙালি সে-সময় একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না ।
সেই বিখ্যাত কবি  একটা সময়ে প্রায়-সন্ধেতেই চলে আসতেন আমার বাড়িতে ।চা খেতে খেতে ওনার কথা মন দিয়ে শুনতাম ।চাকরি করতেন চেতলা বয়েজ স্কুলে । এক সময়ে পবিত্রদাও চেতলা বয়েজে পড়াতেন ।পবিত্রদা পরে বিদ্যানগর কলেজে চলে যান ।


৩৬.
প্রথম প্যারার বড়ো টাইপ ছোটো করতে পারলাম না।তাতে লেখাটির কোনো ক্ষতি হবে না।ভিন্ন  একটা ফাইলে এটা লিখছি।
প্রথমেই জানিয়ে রাখি কবি সমর সেন -এর সঙ্গে দ্যাখা করতে গিয়েছিলাম NOW পত্রিকার দপ্তরে।কবিতা নিতে গিয়েছিলাম । তখন উনি কবিতা লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমার ছোটো পত্রিকা জোয়ার -এর জন্য । এখন ভাবি কতটা বা কী পরিমাণ নির্বোধ হলে এই হেন কাজ করার সাহস হয়।
সমর সেন তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে আমাকে এবং আমার পত্রিকা -কে মেপে নিচ্ছিলেন । আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম ।উনি বসতে বলেছিলেন । আমিও বোকার মতো বসে পড়েছিলাম।
উনি স্পষ্ট  উচ্চারণে বলেছিলেন ---আমি তো কবিতা লিখি না ।
আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সমর সেন কবিতা লেখেন না । তাহলে কে কবিতা লেখেন? কে লিখেছেন ঘুম কেড়ে নেওয়ার কবিতাগুলি ।
আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি,  এত বড়ো মাপের একজন মানুষ  আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন । পরে জেনেছিলাম উনি স্বেচ্ছায় কবিতা থেকে সরে গিয়েছিলেন।
এবার চলে আসি 1970-তে।ওই সালটি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । লেনিন-জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বছর।
মহামতি লেনিন-জন্মশতবার্ষিকী তে প্রথম সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলেন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নাম দিয়ে ছিলেন খাড়া পাহাড় বেয়ে । তাতে বামপন্থী প্রায় প্রত্যেক কবিরই কবিতা ছিল । এমনকি  আমার কবিতাও দয়া করে স্থান দিয়েছিলেন বীরেনদা। এরপর দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত নিলেন লেনিন শতাব্দী নামে ভিন্ন একটি সংকলন প্রকাশ করবেন । লেনিনকে উৎসর্গীকৃত কবিতার সংকলন ।এবং এই সংকলনে যাঁদের কবিতা ছিল বা যাঁদের দিয়ে কবিতা লেখানো হয়েছিল তাঁদের মধ্যে অনেকেই বামপন্থী কবি ছিলেন না, অ-কমিউনিস্ট কবিদেরও সামিল করা গিয়েছিল । এটাই ছিল দীপেনদার লক্ষ্য ।
যাঁরা বিশদে জানতে  আগ্রহী তাঁরা এই বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। কপা দপ্তরে পাওয়া যাবে ।
প্রথম সংস্করণ -এর টাকা অগ্রিম বাবদ দিয়েছিল মনীষা । এবং প্রমাণিত হয়েছিল দীপেনদা ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করেছিলেন । আর আমি ছিলাম দীপেনদার ছায়াকে  অনুসরণকারী।
দীপেনদা যা আদেশ দিতেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম আমি ।
এক হাজার কপি ছাপা হয়েছিল । কিছুদিনের     আশা নিয়ে বের করলাম । বাম-চেতনা বৃদ্ধির একটা নমুনা পেলাম ।যে বই 1970-তে এক হাজার কপি বিক্রি হত  সময় লেগেছিল চারমাস,  আর 2006 থেকে 2017, এই দীর্ঘ সময়ে মোট বিক্রি দুশো কপি। তার  অর্থ হল বামফ্রন্টের শাসনকালে বাম চেতনা কতটা ক্ষয়ে গিয়েছিল, তার নমুনা কিনা জানি না । জানতেও চাই না ।


৩৭.
গতকাল লেনিন-জন্মশতবার্ষিকী তে  ছিলাম । দীপেনদা র সম্পাদনা য় যেমন লেনিন শতাব্দী বের করেছিলাম, পাশাপাশি তরুণ সান্যালের সম্পাদনায়  আরো একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল, তাতেও আমার কবিতাও রেখেছিলেন তরুণদা ।
এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে  একই বিষয়ে একই সংগঠন থেকে দুটি সংকলন প্রকাশের কোনো প্রয়োজন ছিল কি।নাকি কে বেশি লেনিন-জন্মশতবার্ষিকী তে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হল তার  একটা গোপন প্রতিযোগিতা চলছিল ভেতরে ভেতরে ।আমরা তা জেনেবুজে নীরব ছিলাম , এই মুহূর্তে তা প্রকাশ করাটা খুব জরুরি নয়।
আসলে আমি  ইঙ্গিত করতে চাইছি কমিউনিস্টদের বাইরে থেকে দেখলে যতটা  ঐক্যবদ্ধ মনে হত ভেতরে ভেতরে ততটাই বহুধাবিভক্ত ছিল ।
কবিতার বাইরে গিয়ে একটা কথা বলি, প্রথম যুক্ত ফ্রন্টের সরকার গঠনের পর সি পি  এম -এর প্রধান কাজ ছিল শরিকদের দুর্বল করা। অন্য বাম-পার্টিগুলিকে বিকলাঙ্গ করে ফেলা। দ্বিতীয় যুক্ত ফ্রন্ট জমানায় এই কাজ আরো প্রবল হয়ে ওঠে । এর বেশ কয়েকটি দল সিপিএম - সমর্থন ছাড়া হাঁটতেও পারতো না ।
জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব নাকি জনগণ তান্ত্রিক বিপ্লব ---এই নিয়েই তো পার্টি ভাগ হয়েছিল ।তাকে সরল করে বললে বলতে হয় কংগ্রেসের সঙ্গে নিয়ে বিপ্লব নাকি কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লব ।
পরে দেখলাম বা এখনো দেখছি সিপিএম কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়েই চলতে  আগ্রহী বেশি ।আমার প্রশ্ন ---তাহলে পার্টিটা ভেঙে ছিলেন কেন ।
এই ভাঙনের ফলে বামপন্থী কবিলেখকরা বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন মূলত দুই ভাগে । পরে আবার ভাগ। বাম-চেতনার এইই বিভাজন  অনেক বেশি ক্ষতি করেছিল।
পরিচয় নন্দন এই দুটি পত্রিকা নিজের নিজের পথ ধরে চলছিল । ঐক্যের ভিতর চিড় ধরেছিল ।দীপেনদা চেয়েছিলেন সেই ফাটল মেরামত করতে । মূলত সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই লেনিন শতাব্দী ।
এবার ফিরে যাই পরিচয় দপ্তরে । যেখানে বসেই দীপেনদা পরিকল্পনা করেছিলেন । আমি তাঁর অনুগত ক্যাডার ছিলাম মাত্র । এটুকুই আমার প্রাপ্তি।
পরিচয় দপ্তরে যেদিন কবি রাম বসু আসতেন সেদিন  আমার খুব ভালো লাগতো ।রামদা  দীপেনদাকে ব্রহ্মা বলে ডাকতেন। আমি এখনো সেই ডাক শুনতে পাই । কতকাল পরিচয়-এ যাইনি, তাও মনে নেই । কেবল মনে আছে রাম বসুকে----
ভিয়েতনাম লাল সেলাম,
রাম বসু তোর জিভ ছিঁড়ে নেবো।
রাম বসু সোচ্চারে জানিয়ে ছিলেন ভিয়েতনামকে লাল সেলাম জানাবার কোনো অধিকার  আমাদের নেই ।
আমরা তার যোগ্য হতে পারিনি ।
অগ্রজ কবিদের মধ্যে চিত্ত ঘোষ, সতীন্দ্রনাথ মৈত্র, গোলাম কুদ্দুস সিদ্ধেশ্বর সেন   কৃষ্ণ ধর ধনঞ্জয় দাশ প্রায় নিয়মিত  আসতেন । কেবলমাত্র  এটুকু বলে থেমে গেলে গুরুতর  অন্যায় হবে ।
যাঁদের নাম লিখলাম তাঁদের নাম লেখার কোনো অধিকার আমার আছে কিনা, তা বিচার করে দেখতে হবে।
ভাবুন একবার । লিখলাম গোলাম কুদ্দুস -এর নাম ।যে মহান কবি  অনেক  আগেই লিখে ফেলেছেন  ইলা মিত্র কবিতাটি ।----'
ইলা মিত্র স্টালিন নন্দিনী,  ইলা মিত্র ফুচিকের বোন। এহেন গোলাম কুদ্দুস -এর পাশে বসার সুযোগ পেয়েছি  একথা মনে পড়লে এখনো শিহরিত হই ।
ধনঞ্জয় দাশকে তখন হয়তো খুব বেশি গুরুত্ব দিইনি । কিন্তু এখন ভাবি এই ধনঞ্জয় দাশ মার্কসবাদী সাহিত্য বিচার নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা করেছিলেন আমার পাশে বসেই। গ্রন্থটি প্রকাশিত হবার পর বুঝতে পেরেছিলাম ।
শিবশম্ভু পালও মাঝে মাঝে চলে আসতেন পরিচয়-এ।ছন্দে তুখোড় ছিলেন ।প্রকৃত অমায়িক নিপাট ভদ্রলোক ছিলেন শিবুদা।
কেউ মনে করতে পারেন তরুণ সান্যাল -এর কথা লিখছি না কেন । তরুণদা ছিলেন পরিচয়-এর সম্পাদক । তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠিত কবি । অনেক  আগেই তাঁর মাটির বেহালা আমাদের মুখে মুখে ঘোরাঘুরি করে ।
তরুণদা তখন স্কটিশ -এর অগিলভি হোস্টেলের সুপার ।ওই হোস্টেলে ও গেছি, তরুণদার সঙ্গে দ্যাখা করতে ।



৩৮.
গতকাল তরুণদার হোস্টেলে এসে থেমে গিয়েছিলাম ।আজ একটা উপলব্ধির কথা জানাতে চাইছি ।এই আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধিটি কে কীভাবে নেবেন তা বুঝতে পারছি না।আমাকে কেউ ভুল বুঝবেন না, এই অনুরোধ জানিয়ে রাখলাম সবিনয়ে।
আজ ছুটির দিন ।কয়েকজন নবীন কবির সঙ্গে কথা হল। অনেক সময় ধরে।গতকাল  আমি কবি গোলাম কুদ্দুস এবং সিদ্ধেশ্বর সেন -এর কথা লিখেছিলাম । আপনারা কেউ কেউ তা পড়েওছেন। আমি সবিনয়ে  এই দুই কবির কবিতা সম্পর্কে মতামত জানতে চেয়েছিলাম । এদের মধ্যে একজনও এঁদের কবিতা পড়ে নি।নামও শোনেনি সম্ভবত।
আমি অবাক হয়ে গেলাম, কোনো উত্তর দিতে পারিনি ।
আমরা যখন কবিতা লেখা শুরু করি, তখন গোলাম কুদ্দুস পূজিত হতেন । এটা  আমার বানানো কথা নয়। এমনকি কল্পকাহিনিও নয়। একদম বাস্তব যা তাই লিখলাম ।
এর একটা উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি ।
তিনের দশকের  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু এবং অবশ্যই প্রেমেন্দ্র মিত্র যে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল বাংলা কবিতায় তথা কবিতা -প্রেমীদের হৃদয়ে, তা ছিল দুর্ভেদ্য । কিন্তু তখন পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে আরো একটা ব্যাপার ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করছিল, তা হল গণসংগ্রাম নামক এক আন্দোলন । তার অর্থ হল কমিউনিস্ট চেতনার বিকাশ হচ্ছিল । মানুষের মনের মধ্যে --লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই , এই মনোভাব  প্রভাব বিস্তার করছিল ।
তেভাগা আন্দোলন, শ্রমিকের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, কর্মচারীদের মাইনে বাড়াবার লড়াই ---এইসব লড়াই -আন্দোলন কবিশিল্পীদের সংগঠিত করেছিল।তার আগের ফ্যাসি-বিরোধী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাবের ফলেই এইসব মতবাদ শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছিল ।
এই সময়ে  বাংলাসাহিত্যের পাঠককে দখল করে নিয়েছিল বামপন্থী কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীরা।তখন পথে-প্রান্তরে শোনা যেত ---
অহল্যামায়ের কবিতা , সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে হরতাল হয়েছিল ।সলিল চৌধুরীর কবিতা ।
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি ---সুকান্ত ভট্টাচার্য -র কবিতাগুলি ।
ইলা মিত্র স্টালিন নন্দিনী, ফুচিকের বোন।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে ।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার পাঠকও নেহাত কম ছিল না ।
ঠিক এরকম এক পরিস্থিতিতে সন্তোষকুমার ঘোষ উড়ে চলে এলেন আনন্দবাজার -এ। এবং অমিতাভ চৌধুরীও যোগ দিলেন । সন্তোষ ঘোষের পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করলো দ্বিধাহীন ভাবে ।যুগান্তর তখন বাংলার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক ছিল ।কিছুদিনের মধ্যেই সে জায়গা দখল করে নিল  আনন্দবাজার পত্রিকা
জনমত গঠনের কাজ সুচারুভাবে পালন করে চলল আনন্দবাজার ।দেশ সাপ্তাহিক -এর ভার পড়ল সাগরময় ঘোষের ওপর ।
সে সময়ে দেশ এবং আনন্দবাজার -এ কবি এবং লেখকদের যোগদান একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ালো। আনন্দবাজারে বাড়তে থাকলো কবিলেখকদের আধিপত্য ।এলেন  আনন্দ বাগচী, সুনীল বসু, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কবি-লেখকরা।
মতি নন্দী -কে পরিচয় থেকে তুলে আনলেন সন্তোষদা।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রাজ্য সরকারি কর্মী । স্বাস্থ্য দপ্তরে। পি এস সি  পরীক্ষা দিয়ে ঢুকেছিলেন ।বসতেন CMS-এ।মৌলালিতে । তখন সুনীলদা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেসের  দৈনিক পত্রিকা জনসেবক -এ টুকটাক কাজকর্ম করতেন ।সাহিত্যের পাতার কিছু কিছু দায়িত্ব পালন করতেন ।তাছাড়া কৃত্তিবাস তো ছিলই । তরুণ কবিদের মধ্যে সুনীলদা প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছেন । এই সময়ে সুনীলদা  আমন্ত্রণ পেলেন আমেরিকা যাওয়ার ।লেখক হিসেবে ।
ফিরে এসে জয়েন করলেন আনন্দবাজারে।
এবং গোটা বাংলা কবিতায় তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়লো।সুনীলদা প্রায় একক প্রচেষ্টায় বাম মনোভাবের কবিদের পরিবর্তে হাজির করলেন নতুন প্রজন্মের কবিদের।নতুন কবিতার দরজা খুলে গেল।



৩৯.
সুনীলদার কৃত্তিবাস এমন  একটি কবিতার পত্রিকা যা সামগ্রিক ভাবে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রকে অনেকটাই  এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
কৃত্তিবাস-এর পরিকল্পনাটি ছিল কবি দীপক মজুমদারের । দীপকদার মতো প্রতিভা বাংলা কবিতায় দ্বিতীয়টি নেই । দীপকদার ভ্রমণ -সংক্রান্ত লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে আর কেউ ভ্রমণ সংক্রান্ত কোনো লেখার স্পর্ধা দেখাবেন না । ওই লেখাটিই প্রথম এবং শেষ লেখা ।আর কাব্যনাটক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে অমল ও বেদানার কুকুর কাব্যনাটকটির কথা।আর যাঁরা নিজেদের স্বেচ্ছাচারী শিরোনামে চিহ্নিত করতে চাইতেন তাঁদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া উচিত ছিল দীপক মজুমদারের জীবন প্রণালী -র খণ্ডচিত্র।
আমার খুব কষ্ট হয় দীপকদা স্বেচ্ছায় কবিতা থেকে সরে গিয়েছিলেন । না গেলে আমাদের লেখার কোনো জায়গা  থাকতো না । দীপকদা  একাই সব লিখে দিতেন ।
আমার প্রথম যৌবনে দীপক মজুমদারের সান্নিধ্য পেলে আমি নিজেকে অনেক আগেই গঠন করে নিতে সক্ষম হতাম ।1993 অবধি অপেক্ষা করতে হত না। আমাদের  অগ্রজ দের মধ্যে দীপকদাই প্রথম বহুরৈখিকতাকে দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন । জানতে পেরেছিলেন ভাষার  অমোঘ শক্তির কথা।
যাঁরা চিরটাকাল নিজেদের জীবনের বিভিন্ন পর্বকে মিথের পর্যায়ে নিয়ে যাবার চেষ্টার কসুর করেননি তাঁরা জেনেও বুঝতে চাইতেন না যে তাঁরা চিরটাকাল দীপক মজুমদারের অক্ষম  অনুকরণ করে গেছেন । আগামীকালের কবিলেখকরা এটা প্রমাণ করে দেবেন। আর ছিলেন তন্ময় দত্ত।তন্ময় দত্ত -র ছন্দ জ্ঞান এতটাই প্রবল ছিল তিনি তাঁর সমকালীন কবিদের প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন । বিশেষ এক ঘটনার জন্য তন্ময় দত্ত কবিতা থেকে সরে গিয়েছিলেন । এই ঘটনা প্রায় সকলেই জানতেন ।কিন্তু কী কারণে কেউই কখনো প্রকাশ্যে আনেননি , তা আমি বলতে বাধ্য নই । এই ঘটনার  CBI তদন্ত হওয়া উচিত ছিল । এখনো সেই সময়ের কৃত্তিবাস -এর অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় -এর উচিত প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করে দেওয়া ।
আমার বিশ্বাস তন্ময় দত্ত কবিতা থেকে সরে যাবার ফলে বাংলা কবিতার ভয়ানক ক্ষতি হয়ে গেছে, যা আর কখনোই পূর্ণ  হবে না ।


৪০.
বন্ধুবর অতনু তন্ময় দত্ত -র বইয়ের নাম জানতে চেয়েছে । সত্যি কথা বলছি  আমি ওনার  কোনো কাব্যগ্রন্থের নাম জানি না । তবে একটি ভয়ংকর কথা শুনেছি ।  যার সত্যতা  আজ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। আমি যা বলছি তা কখনোই প্রমাণ করতে পারবো না,  একারণে নামটা  ঊহ্য রাখছি ।
তন্ময় দত্ত তাঁর নিজের লেখা  একটি কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন কৃত্তিবাস দপ্তরে । সম্ভবত সুনীলদার হাতে । বইটি যখন প্রকাশিত হল তখন কবির নাম বদলে গিয়েছিল । তন্ময় দত্ত -পরিবর্তে  অন্য নাম বসে গিয়েছিল ।
কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি।অবিশ্বাস্য  এই ঘটনার যাঁরা সাক্ষী তাঁদের কেউ কেউ এখনো জীবিত  আছেন, তাঁদের উচিত হবে সত্য  উন্মোচন করা ।
এর বেশি বলা শোভন হবে না । বলে  এখানেই প্রসঙ্গটি এখানেই শেষ করতে চাইছি ।বন্ধুদের কাছে  একান্ত  অনুরোধ এই লেখাটি পোস্ট হবার পর এই বিষয়ে কেউ কোনো আলোচনা করবেন না ।জেনে গেলেন, যাঁরা বোঝার বুঝেও গেলেন, তাহলে অহেতুক জল ঘোলা করবেন কেন।
এই প্রসঙ্গটি না লিখলে আমি মানসিক শান্তি পেতাম না,  একারণেই লিখলাম, কেউ ভুল বুঝবেন না ।
তন্ময় দত্ত - র ভাইপো অনাময় দত্ত  আমার বিশেষ বন্ধু ছিল ।খুবই ভালো কবিতা লিখতো।কফিহাউসে  আমাদের টেবিলে বসতো।সম্ভবত পার্থ রাহা, সুদর্শন রায়চৌধুরী সহ আরো কেউ কেউ  সেসময় আমাদের  একাত্ম ছিল ।
তন্ময় দত্ত  একদিন  একটি দীর্ঘকবিতা শুনিয়ে ছিল  একান্তে। তখন ধ্বংসকালীন চলছে, কবিতাটি ধ্বংসকালীন -এর ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী লেখা কথা ছিল কবিতাটি সাম্প্রতিক জন্য দেবে । কিন্তু সেদিন দেয়নি।কথা দিয়েছিল পরদিন ভালো করে কপি করে দেবে।
অনাময়ের লিউকোমিয়া অসুখটা ছিল ।আমরা সবটা জানতাম না ।হঠাৎই খবর পেয়েছিলাম অনাময় নেই ।সেই প্রথম বন্ধু বিয়োগ কী তা বুঝতে পেরেছিলাম । অনাময়ের ধ্বংসকালীনে যোগদান পুরো আন্দোলনে একটা সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলতো। হয়তবা ভিন্ন  এক ইতিহাস রচিত হত।পবিত্রদা কানন  অনাময় এবং আমি একসঙ্গে দুবছর একসঙ্গে থাকলে হাংরির পাশাপাশি  আমরাও  একটা জায়গা করে নিতে সক্ষম হতাম। আমি হয়ত পরিচয়-এ মিশে যেতাম না ।
ধ্বংসকালীন চলাকালীন সময়ে  এক নবীন ছাত্র পবিত্রদার সূত্রে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। আজকের চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় তখন নেহাতই ছাত্র, কিন্তু তখনই ওর পাণ্ডিত্যকে  আমরা সকলেই সমীহ করতে শুরু করেছিলাম । সেই সঞ্জয় পবিত্রদার ইবলিশের আত্মদর্শন সম্পর্কে  একটা বড়ো গদ্য লিখে  আনলো।সেই লেখা বই হয়ে প্রকাশিত হল।বেশ সোরগোল পড়ে গেল । ওই লেখাটিতে ইবলিশের আত্মদর্শন -ই প্রাধান্য পেয়েছিল, ধ্বংসকালীন সেভাবে পায়নি।হয়ত পবিত্রদা  এমনটাই চেয়েছিলেন । আমরা কি কষ্ট পেয়েছিলাম ? তা আমার মনে নেই, এব্যাপারে কাননকুমার ভৌমিক প্রামাণ্য কিছু বললে তা মেনে নিতে আমি বাধ্য থাকবো। প্রাজ্ঞ সঞ্জয়কে  এবিষয়ে বিব্রত না করাই শ্রেয় হবে, কারণ সঞ্জয় তখন নেহাতই নবীন কিশোর । সুনীলদার শব্দবন্ধটি প্রয়োগের লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না ।
আমি ভুল ক্লাবে সই করেছিলাম, আমার গঠনতন্ত্র ছিল কৃত্তিবাসী, কিন্তু খেলেছিলাম ভিন্ন দলের হয়ে । এই স্বীকারোক্তি এতদিন পরে করলাম, না করলে অন্যায় হত।বেলাশেষে এই কথাটা বলতে পেরে স্বস্তি পেলাম ।



৪১.
গতকালের পোস্ট থেকে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা আমি করতে চাইনি।আপাতত  এর বেশি কিছুই বলছি না।
সুন্দরের দিকে তো এখুনি শেষ হয়ে যাচ্ছে না।এখনো অনেক সময় পাবো।তখন প্রমাণ দাখিল করা যাবে ।আমার বিশ্বাস ছিল যাঁরা কবিতার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের ঘটনাটি না-জানা নয়। আমি আমার সময়ের একটি ভয়ংকর ঘটনাটি কথা  উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম মাত্র । কিন্তু এটা যে পাবলিক হয়ে যাবে, তা আমার কল্পনায় ছিল না ।
আমি আমার চরিত্রের  অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই  এটা লিখেছিলাম । তবে সুনীলদার জীবিত অবস্থাতেই  এটা লেখা উচিত ছিল । আমি তো তখনো বারবার লিখেছি।সকলেই নীরব ছিলেন ।
এটা  আমার আত্মজীবনীর  অংশ হিসেবে ছাপা হবে, তখন যেন কেউ আমাকে ভুল না বোঝেন সে জন্যই  এই পরিক্রমা । যদি এর ফলে যদি কেউ আহত হয়ে থাকেন, তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমাপ্রার্থী ।

এখন ফিরে  আসি সুন্দরের দিকে । তার অর্থ কি এতক্ষণ সুন্দরকে পরিবর্তন করে অসুন্দরের দিকে চলে গিয়েছিলাম ? তা নয় । সুন্দরের অনেকগুলি রং আছে ।আমরা কেবলমাত্র পরিচিত রংগুলিকেই চিনি এবং জানি।এই আমরা কিন্তু গৌরবার্তে বহুবচন । এই আমরার মধ্যে  আমি অনুপস্থিত । কারণ সুন্দরের পরিচিত রংগুলিকে যেমন চিনি, অপরিচিত রংগুলিকে ঠিক ততটাই চিনি। আমি  জানি ভ্যায়লেট রঙের যে সুন্দরটি বিরাজ করে তার মাথার ওপর কাঁটার মুকুট থাকে । আমরা সাধারণত সেই বেগুনি সুন্দরকে গ্রাহ্য করি না, আমরা সোনালি রঙের সুন্দরের দিকে মনোযোগী হই। এই আমরার মধ্যেও আমি নেই।
আমি কি  আমার  অবস্থান বোঝাতে সক্ষম হলাম ।হয়ত হলাম, হয়তো বা হলাম না । তার জন্য গীতাঞ্জলি অশুদ্ধ হয়ে যাবে না ।

প্রথম বার শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম শৈবাল কে ফেরত আনতে । গীতাঞ্জলি থেকে শান্তিনিকেতন -এ চলে এলাম, তাও বুঝিয়ে লিখতে হচ্ছে । আমি চিরটাকাল পাঠক কখন কীভাবে  আমাকে পড়বেন, তা জানা ছিল ছিল না । এখন জেনে গেছি আজ রাত্রে কারা পড়বেন,  আগামীকাল সকালে কারা পড়বেন। এই ভাবে চেনা পাঠকদের সান্নিধ্য  আমার কাছে নতুন । কাজেই  আমার তর্জনীকে সেভাবেই গাইড করতে হচ্ছে ।হার্ডকপির লেখা সবটা  আমাকে লিখতে হয় না ।কিছুটা  আমি লিখি, কিছুটা আমার পরিচিত কলমটি লেখে।যাঁরা  এই সত্যটি জানেন না, তাঁরা আমার লেখালেখির বিষয়টি পুরোপুরি জানেন না ।
দ্বিতীয় বার শান্তিনিকেতন গেলাম1967-এ ।সেবছর চাকরি পেয়ে জয়েন করলাম রাইটার্স -এ।হেলথ ডাইরেক্টরেটে।আমার ভাগ্য সবসময়ই  আমার অনুকূলে থেকেছে ।এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।আমার সহকর্মীদের কথা আগের কোনো এপিসোডে লিখেছি।

সনৎ বন্দ্যোপাধ্যায় আর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম  পৌষমেলায় শান্তিনিকেতন যাবো।যাবো মানে যাবোই।কোথায় থাকবো তা ঠিক না করেই চেপে পড়লাম ট্রেনে । ট্রেন থেকে নেমে শ্রীনিকেতনের দিকে হাঁটছি । অংশুমানের হোস্টেলে যদি জায়গা পেয়ে যাই সেই আশায়।
পথচলার সঙ্গী  এক কিশোর, সে নিজে থেকেই প্রস্তাব দিল তাদের হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে ।  ওই কিশোরটি শ্রীনন্দা -র ছাত্র । ঢুকে গেলাম শ্রীনন্দায়।থাকার ব্যবস্থাও হয়ে গেল। অদ্ভুত যোগাযোগ । সকালে উঠে প্রার্থনা করতে হবে, এরকম শর্ত ছিল ।
 প্রার্থনা মানে তো রবীন্দ্রগান । এতে আপত্তি করার মতো মূর্খ  আমি ছিলাম না, সনৎও রবীন্দ্র পূজারী ।অতএব  আর কোনো কথা নয় ।
তখন পৌষমেলাতেই কনভোকেশন হত।সেই বছরই  ওই সময়ে হওয়া শেষ কনভোকেশন ।কারণ শ্রীমতী  ইন্দিরা গান্ধি তখন প্রধান মন্ত্রী । মঞ্চে তখন নিজের মুখে নাম বলছিলেন শ্রীমতী গান্ধি । হঠাৎই মঞ্চের পাশে বোমা ফাটলো।
এই অভিজ্ঞতার কথা  আগামীকাল ।


৪২.
আজ চাঁদু-র মৃত্যুদিন ছিল । চাঁদু-কে চিনতে অসুবিধে হলে শুভ চট্টোপাধ্যায়ের খোঁজ  করুন।চাঁদু-কে আমি  পেয়েছিলাম শান্তিময়ের মাধ্যমে । শান্তি-চাঁদুরা বহরমপুর থেকে রৌরব নামে  একটি পত্রিকা বের করতো। তখন  আমি লেখা থেকে নির্বাসনে ।কিন্তু বইমেলায় যেতাম । ওই বইমেলাতে আমার  একটা গুপ্তঘর থাকতো ।সেই গুপ্তঘরে  আমাদের  আড্ডা বসতো।জলপথ-পরিক্রমা চলতো।সমিতির মতো সেসব কথা লেখা যাবে। চাঁদু-র মৃত্যুদিন কীভাবে চাঁদু-কে বাদ দেওয়া যাবে তা  আমি জানি না,  একারণেই চাঁদু-কে নিয়ে আসতে হল কিছুটা আগেই ।

আগের দিন শান্তিনিকেতন -এ ছিলাম ।উঠে ছিলাম শ্রীনন্দা  আবাসিক স্কুলের হোস্টেলে ।
বিকেলে অংশুমানের সঙ্গে দ্যাখা করার জন্য গিয়েছিলাম শ্রীনিকেতনের হোস্টেলে । অংশুমানের ঘরে তখন একটা মিটিং চলছিল । আমরা প্রবেশ করায় সে মিটিং বন্ধ হয়ে যায়নি। অংশুমান ছাড়াও আরো দুজন কলকাতার ছাত্র -ফ্রন্টের নেতা আমার পূর্ব -পরিচিত ছিল ।
মিটিং শেষ হবার পর শ্রীনন্দায় ফিরে  এসেছিলাম । পেয়েছিলাম গরম গরম খাবার, বেশ মুখরোচক । বিছানাও  অপ্রত্যাসিত উষ্ণ ।ভোরে মাঙ্গলিক । মোহরদি  কি সেদিন গান গেয়েছিলেন, মনে পড়ছে না ।
মনে পড়ছে সেই বিস্ফোরণের শব্দ ।
শ্রীমতী গান্ধি প্রাপকদের নাম ঘোষণা করে শংসাপত্র তুলে দিচ্ছিলেন ।হঠাৎই মঞ্চের বাঁদিকে বোমাটি ফেটেছিল ।
আর সঙ্গে সঙ্গেই স্টেশনের পথ ধরেছিলাম ভায়া শ্রীনন্দা ।কেন এই পলায়ন তা  আমি জানি না । আমি বা সনৎ কেউ তো আর বোমা মারিনি।বোমা-মারার পরিকল্পনাও করিনি ।মনে  আছে ফেরার সময়ে  আমাদের দুজনের কাঁধেই গামছা ছিল । সেই গামছার সাহায্যে আমরা কি গ্রাম্য জনতার সঙ্গে মিশে যেতে চেয়েছিলাম ? এরও কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আমার ফিডব্যাক -এ নেই ।
সেবার মেলা দ্যাখা হয়নি, এটা বেশ মনে  আছে ।

আজ সাপ্তাহিক কবিতা পাক্ষিক -এর শারদীয় সংখ্যার  আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হল আমাদের রুফটপ চ্যানেলে।অনেকেই  এসেছিল।সুন্দরবনের লাগোয়া অঞ্চল থেকে  দুজন নবীন কবি  এসেছিল ।এইসবের জন্য  এই লেখাটা শুরু করতে দেরি হল।শেষও করতে হল ছোটো ইনস্টলমেন্ট দিয়ে । আগামীকাল কিছুটা বেশি লিখে মেকআপ  করে দেবো।



৪৩.
শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পর বেশ কয়েকদিন কিছুটা ভয়ে ভয়ে ছিলাম । কারণটা জানি না।তবে সেই ভয় যে অমূলক  ছিল,  এটা বুঝতে অনেকটা সময় পার হতে হয়েছিল । রোজই মনে হত আজই আমার কাছে পৌঁছে যাবে পুলিশ । জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে যাবে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় কীভাবেই বা তার উত্তর দেবো তারও একটা খসড়া করে রেখেছিলাম ভেতরে ভেতরে।কারণ ঘটনাটির গুরুত্ব কম ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বলে কথা।
বেশ কয়েকদিন পর ফিরে পেয়েছিলাম নিজের প্রাত্যহিকতাকে।
বাড়ি > অফিস > বারদুয়ারি > পবিত্রদার বাড়ি > রাত্রে নিজ নিকেতনে ফিরে আসা।
মাঝে মাঝে নতুন বন্ধু লাভ।নতুন কবিতা কিংবা গল্প পাঠ। এই পাঠের আয়োজনটা তখন থেকেই সরে আসতে শুরু হয়েছিল ২২বি প্রতাপাদিত্য রোড থেকে ৩৬ডি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে । তখন  আমি দোতলার মাঝের ঘরে থাকতাম। ওই ঘরেই যাবতীয় পঠনপাঠন ।তুষার চৌধুরী ছিল নিজ -মহিমায়। তখন সমীর চট্টোপাধ্যায়ও নিত্যসঙ্গী । তবে তখন তিনসঙ্গী অনেক দূরের তীর্থ।
গল্প পাঠের ব্যাপারে এক নম্বর স্থানে ছিল  অমর মিত্র । কাজের জায়গা থেকে কখনোই খালি হাতে ফিরতো না  অমর। সঙ্গে থাকতো সদ্য লেখা গল্প । গল্পের চরিত্র সব উঠে  আসতো গ্রাম থেকে । গ্রামের  হৃদয় থেকে এই চরিত্রগুলি তখন সাধারণ পাঠকের থেকে দূরে সরে গিয়েছিল,  অমর তাকে ফিরিয়ে এনেছিল নতুন আঙ্গিকে, নতুন ভাষায়।
শচীন দাশ এবং অসীম ও গল্প পাঠ করতে আসতো নিয়মিত শচীন মেপে কথা বলতো যেমন , লিখতোও মেপে।প্রতিটি গল্পই নিখুঁত । হাতের লেখাটাও এখনো চোখের সামনে ভাসে ।
আর অসীমের কথায় পুববাংলার একটা টান ধরা যেত। অসীমের রসিকতা ছিল  অনন্য । প্রতিটি গল্পই ছিল পরীক্ষামূলক।  
এই সময়ে একবার গল্পকার ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের  আমন্ত্রণে ডায়মন্ডহারবার গিয়েছিলাম ।দলবদ্ধভাবে ।সেই  আতিথেয়তার কথা  এখনো মুছে যায়নি। ঝড়েশ্বর সেদিন  একটা  উপন্যাসের কথা বলেছিল।যেটা ও তখন লেখার কথা ভাবছিল। আমরা সকলেই  ওকে উৎসাহিত  করে ছিলাম ।
অনেক খুচরো ঘটনা হারিয়ে গেছে । উচিত ছিল  একটা  ছোটোখাটো নোটবই -এ লিখে রাখা ।কবিতা পাক্ষিক পর্বে দেখেছিলাম কবি উৎপলকুমার বসু নোট লিখে রাখতেন, কিন্তু কখনো তা প্রকাশ করেননি ।তাহলে কেন লিখতেন, সেসব নোট কার কীকাজে লেগেছে তাও জানি না । উৎপলদা হয়ত ভেবেছিলেন সময় মতো লিখবেন, কিন্তু লেখেননি, সময় পাননি বলেই।কারণ উৎপলদা  চাইতেন নিখুঁত বা পারফেক্ট কবিতা লিখতে । একটা কবিতা কুড়িবার লিখতেন, নিজেকে সন্তুষ্ট করার জন্য । সেসব কথা পরে আসবে।
এর কাছাকাছি সময়ে পবিত্রদার বিদ্যানগর কলেজের সহকর্মী শচীদার দৌলতে কলেজ স্ট্রিট - আমরা প্রবেশাধিকার পেয়েছিলাম।শচীদা নিগুঢ়ানন্দ পেননেমে যা লিখতেন তার বেশ বাজার ছিল । তিনিই আমাদের হাত ধরে পৌঁছে দিয়েছিলেন বইপাড়ায়। কথাটা সবটা ঠিক লিখিনি ।শচীদা নিয়ে গিয়েছিলেন পবিত্রদাকে।আমি জুড়ে গিয়েছিলাম,নিয়মের সূত্র মেনে । তখন  একটা কথা চালু ছিল --- পবিত্র -প্রভাত । যেমন ছিল দীপেন-দেবেশ কিংবা অলোক- আলোক। এটাকে এটাকেও আমি মেনে নিতে পারি না ।কারণ পবিত্রদা ছিলেন ছয়ের দশকের  অগ্রগণ্য কবি, আর আমি ছিলাম কবিতা - কর্মী। এখনো আমি নিজেকে  একজন কবিতা-কর্মী হিসেবেই দেখি,  যার একমাত্র কাজ কবিতাকে আপডেট করা । তার জন্য ঠিক যে কবিতাগুলি লেখার প্রয়োজন ঠিক ততগুলি কবিতাই লিখি,  তার থেকে একটিও বেশি কিংবা কম নয়।
তো সেই সময়ে পুস্তক বিপনি না পুস্তক মহল ঠিক নামটা  মনে পড়ছে না। মালিক ছিলেন কনকবাবু।বেলেঘাটা য় থাকতেন,  ওখানে একটা বই -এর দোকান ছিল । ওই প্রকাশনী পবিত্রদার শ্রেষ্ঠ কবিতা  এবং পবিত্রদার সম্পাদনায় ষাটের কবিতা । দুটি বই নির্মাণে  আমার হাত সচল ছিল । এটুকুই মনে আছে ।
কনকবাবুদের প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাইরি ।তার পুরো কাজটি  আমি  একাই করেছিলাম ।পরিবর্তে কেবলমাত্র ভূমিকা লেখার সুযোগ পেয়েছিলাম ।সম্পাদক হিসেবে  অবশ্য কারো নাম ছিল না ।
বিভূতিভূষণের ডাইরিতে দুদিন লেখা ছিল--- আজ ঈদের ছুটি । এই সংশয় থেকে মুক্ত হতে সেই বছরের ছুটির লিস্ট বের করেছিলাম  অর্থ দফতর থেকে । আর্কাইভ থেকে বের করেছিলাম সেই বছরের পাঁজি । এই ঘটনাটি লিখতে  একদম সময় লাগলো না, কিন্তু কাজটা করতে বেশ কয়েকদিন সময় লেগেছিল । আসলে  প্রথম থেকেই পারফেক্ট তথ্য দেওয়াটা আমার  স্বভাব,  এই থেকে বিচ্যুত হতে পারি না বলেই যাবতীয় সমস্যা  এবং বিপদ।

প্রভাত চৌধুরী
কবিতা পাক্ষিক


No comments:

Post a Comment