এখন তরঙ্গ তে লেখা পাঠান প্রতিমাসের ৫ থেকে ২০ তারিখ অবধি

মানসী গাঙ্গুলী




ছোট গল্প




মনের বন্ধু

     জীবনে চলার পথে একা যুদ্ধ করতে করতে শ্রীরূপা আজ ক্লান্ত, অবসন্ন। সেই কবে আর্যর সাথে ছাড়াছাড়ি, প্রায় অকারণেই বলা যায়।ভাবে শ্রীরূপা, ভালবেসে বিয়ে,এত ভালবাসা, এত ব্যকুলতা দু'জনের দু'জনের জন্য,সব শেষ হয়ে গেল কেবল আর্যর মায়ের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্যের কারণে। মায়ের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য, ভালবাসা, সে তো থাকবেই, শ্রীরূপা তো তা অস্বীকার করে না, তাই বলে বউয়ের প্রতি থাকবে না কিছু! কত অভিমান করেছে সে এই নিয়ে, কিন্তু তাতে আর্যর যেন কিছু যায় আসে না।

        মা অন্তঃপ্রাণ আর্যর বিয়ের পর থেকেই তার মা শ্রীকে মেনে নিতে পারেননি ভালভাবে। অল্পবয়সে স্বামী হারিয়ে ছেলেকে বুকে আগলে তাঁর দিন কেটেছে, সেসব জানে শ্রী, তাই বলে ছেলের বিয়ের পরও তিনি ছেলেকে আগলে রাখবেন! সারাদিনের পর বাড়ী ফিরলে বিভিন্ন কারণে নিজের ঘরে ডেকে একথা সেকথায় আটকে রাখতেন, বউয়ের কাছে ঘেঁসতেই দিতেন না, কোনোদিন সিনেমা যাবার ঠিক করলে কোনো না কোনো উপায়ে তিনি তা বানচাল করে দিতেন। এছাড়া কোথাও বেড়াতে গেলে,মাকে একা রেখে যাওয়া যাবে না বলে ওরা দু'জন এমনকি হানিমুনেও একা যেতে পারে নি, সেখানেও সঙ্গে মা। শ্রী ভেতরে ভেতরে অসহিষ্ণু হয়ে উঠত কিন্তু এব্যাপারে আর্যকে কিছু বললে সে ভীষণ বিরক্ত হত, তাই শ্রী দিনদিন মনে মনে ভীষণ একা হয়ে পড়ছিল।সে বুঝতে পারত মায়ের প্রতি আর্যর আনুগত্যের সুযোগে তার মা প্রতিমূহুর্তে শ্রীকে আর্যর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতেন। শ্রী মনে মনে অনেকবার ভেবেছে ছেলেকে ভালবাসেন তাই হয়তো ছেলের পাশে তাকে সহ্য করতে ওনার অসুবিধা, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে,এই ভেবে বরং একটু করুণাই সে করেছে ওনাকে।আবার ভেবেছে অল্পবয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন তাই ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুখ তিনি মেনে নিতে পারেন না।তবু মন মানে না, আর্যকে মনের মত করে পেলই না সে বিয়ের পর থেকে একদিনের জন্যও, মাঝখানে মা এমনভাবে এসে দাঁড়ান যে ওদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সুখ বাসা বাঁধতে পারে নি,টুকটাক অশান্তি লেগেই থাকত।

     এরপর নানা অশান্তির মাঝেও জৈবিক নিয়মেই তাদের একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। তাকে ঘিরে বাড়ীতে বেশ একটা আনন্দের ভাব। ঠাকুমাও নাতিকে নিয়ে খুব খুশী, সারাদিনই প্রায় নাতিকে নিয়ে থাকেন কিন্তু শ্রী লক্ষ্য করত আর্য বাড়ী ফেরার সময় হলেই নাতিকে তিনি শ্রীর কাছে দিয়ে যেতেন। ছেলে নিয়ে ব্যস্ত থাকার ফলে সে যাতে আর্যর সাথে বেশি সময় কাটাতে না পারে। এরপর ছেলের ধুমধাম করে অন্নপ্রাশনও হল,মামাবাড়ী ভাতও হল, সব আনন্দের মাঝেও আর্যর মা কিন্তু সেই একইরকম ভাবে শ্রী ও আর্যর মাঝে সারাক্ষণ এসে পড়তেন,এমনকি সেবার জামাইষষ্টীতে ওদের বাপের বাড়ী নিমন্ত্রণ হলে আর্যর মা ভীষণ অসুস্থের ভান করে বিছানায় পড়ে থাকলেন। বাড়ীতে ডাক্তার ডাকা হলে তিনি পরীক্ষা করে যখন বলেন তেমন কিছু নয়, প্রেসক্রিপশনে কেবল ভিটামিন লিখে দিয়ে যান,তখন শ্রী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। সহ্যেরও তো একটা সীমা থাকে! সে রাগ করে ছেলেকে নিয়ে একা বাপেরবাড়ী চলে যায় আর বলে যায় আর্যকে মা অথবা বউ যে কোনো একজনকে বেছে নিতে হবে।বলাই বাহুল্য,আর্য মাকেই বেছে নিয়েছিল আর সেদিন থেকে শ্রী ছেলেকে নিয়ে একা তার বাবা-মায়ের সাথে।আর্যও তাকে ফিরিয়ে আনতে যায়নি,অভিমান দু'জনের মাঝে দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছে।একসময়ে শ্রীর বাবা-মাও গত হয়েছেন, ছেলে স্কুলে ভর্তি হয়েছে।আর্যর সাথে শ্রীর আইনগত সেপারেশন হয়নি যদিও কিন্তু মানসিকভাবে ওরা দু'জনে দু'জনের থেকে অনেক যোজন দূরে।

        আর্য অবশ্য নিজের দায়িত্ব অস্বীকার করেনি, প্রতিমাসের ১তারিখে ছেলে ও শ্রীর জন্য ব্যাঙ্কে ওদের জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা সে ফেলে দেয় যদিও শ্রীর বাবার যা টাকা রয়েছে তাতেই তার প্রয়োজন মিটে যায় আর অভিমানে আর্যর টাকায় সে হাত দেয় না।দু'জনের মুখ দেখাদেখি নেই বেশ কয়েকবছর হয়ে গেছে,আর্য তার মাকে নিয়েই রয়েছে। তিনি ৮২ বছর বয়সেও বহাল তবিয়তে,কোনোদিন নাতিকে দেখার ইচ্ছেও প্রকাশ করেন না। এদিকে ছেলে টুবাই বড় হতে লাগল,আর্য স্কুলে গিয়ে তার সাথে দেখা করে আসে,শ্রী জানে তা, এতে তার কোনো আপত্তিও নেই।বস্তুত তাদের মান-অভিমানের জেরে ছেলে বাবার আদরে বঞ্চিত, এতে শ্রীর মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করে আর তাই যতটা সম্ভব ছেলেকে ভালবাসায় ভরিয়ে রাখতে চায় সে।তবুও বড় হবার সাথে সাথে ছেলে ক্রমশঃ অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে থাকে, শ্রীর একার পক্ষে সামলানো দায় হয়ে উঠছে।যে ছেলে মা অন্তঃপ্রাণ ছিল,মায়ের গলাটা জড়িয়ে ঘুমাত, সে আজকাল আলাদা শোয়,মায়ের সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া বাক্যালাপ করে না অথচ একা এই ছেলেকে মানুষ করার জন্য শ্রী কত আত্মত্যাগ করেছে।ছেলেই তার ধ্যানজ্ঞান, তার পড়াশুনো, ব্যায়াম, খেলাধূলা খাওয়াদাওয়া এইসব নিয়েই শ্রীর সারাদিনের পরিকল্পনা চলত।আর্য নেই পাশে,বাবা-মা গত হয়েছেন কয়েকবছর হয়ে গেল, ছেলে দূরে সরে যাচ্ছে দিনে দিনে,কাছে টানতে গেলে দুর্ব্যবহার করে,একাকীত্বের যন্ত্রণায় শেষ হয়ে যাচ্ছে শ্রী,যখনতখন তার দু'চোখ জলে ভরে যায়, নীরবে দায়িত্ব পালন করে চলেছে শুধু।ভাবে আর্য এত মা-ভক্ত আর তার ছেলে হয়ে টুবাই কি করে তার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।

     টুবাইয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হবার কিছুদিন পর এক বন্ধুর পরামর্শে শ্রী ফেসবুক জয়েন করে।বেশ কিছু বন্ধুও ওর হয়েছে এখন, কিছু পুরনো বন্ধুকেও খুঁজে পেয়েছে ও ফেসবুকের দৌলতে।তাদের সঙ্গ পেয়ে শ্রী বেশ খুশীই থাকে এখন। হোয়াটসঅ্যাপেও বেশ কিছু গ্রুপে রয়েছে ও।একাকীত্ব ঘুচেছে,বেশ আনন্দে থাকে এখন ও,মাঝে মাঝে ওদের জমায়েত হয়,নির্ভেজাল আড্ডা, হাসি,ওদের সাথে শ্রী যেন তার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলিতে ফিরে যায়।তবে এসবের জন্য ছেলের কোনো ক্ষতি যাতে না হয় সে বিষয়ে শ্রী যথেষ্ট যত্নবান,তবু যেন ওর মনে হয় টুবাইয়ের এসব পছন্দ হচ্ছে না।এরপর মাধ্যমিকে টুবাই ভাল রেজাল্ট করায় আর্য তাকে একটা অ্যানড্রয়েড ফোন কিনে দিয়েছে টুবাইয়েরই আবদারে,আর এই ফোনই হল কাল। সারাক্ষণ ফোন ঘাঁটাঘাঁটি,পড়ার সময়ও বারবার ফোন খুলছে,সেও ফেবুতে প্রোফাইল খুলেছে,নেশার মত সেটার পিছনে পড়ে থাকে সে ছেলে।প্রথম প্রথম কিছু লুকোচুরি সে করত,এখন সে মাকে গ্রাহ্যও করে না।শ্রী ভাল কথায় বোঝায় পড়ার সময় ওসব না করতে কিন্তু সে যখন শোনে না শ্রী রাগ করে বকাবকি করে আর তাতে সে ছেলেও ততোধিক রাগত স্বরে মাকে যাচ্ছেতাই বলে,তার ফেসবুক,হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সাথে যোগাযোগ,বেড়ানো,সিনেমা দেখা এই নিয়ে কটুক্তি করতে থাকে।শ্রী ঝাঁপিয়ে বিছানায় গিয়ে পড়ে, কেঁদে কেঁদে বিছানা ভাসায় কিন্তু ছেলে একবারও আসে না মায়ের কাছে,দুঃখপ্রকাশ করা বা ক্ষমা চাওয়া সে সব তো নেইই।শ্রী কোনো দিশা পায় না,কি করে এ ছেলেকে সে সামলাবে।ভাবে সব ছেড়ে দেবে যাতে ছেলে তাকে কিছু না বলতে পারে।আবারো ভাবে সারাজীবন সব কিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে এইটুকু বাঁচার রসদকে সে আঁকড়ে ধরেছিল,তাও ছাড়তে হবে!হ্যাঁ,ও সব ছেড়ে দেবে, ছেলেকে মানুষ করতে হবে যে।

       ফেবুতে পোস্ট দিল সে,আর ফেবুতে থাকছে না,হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন গ্রুপেও জানিয়ে দিল।মুশকিলআসান করল কিন্তু ফেবুই,ফেবুতে ওর এক বন্ধু ছিল সাইক্রিয়াটিস্ট,'মনের বন্ধু' নামে ছিল তার প্রোফাইল,ওর সাথে মেসেঞ্জারে প্রায়ই কথা হত শ্রীর, দু'জনের বন্ধুত্বটাও বেশ গাঢ় এখন।সে শ্রীর পোস্ট দেখে ওকে ইনবক্সে বারণ করে এসব করতে,তারপর নানারকম ভাবে ওকে গাইড করতে লাগল।এরপর একদিন সে ওর বাড়ী এল ছেলে বাড়ীতে থাকাকালীন।ছেলে মায়ের সাথে যাই করুক বাইরের কারো সামনে সে অসভ্যতা করত না।নতুন এই মাসিটি তার সাথে অনেক গল্প করল,টুবাইয়ের মাসিকে খুব ভাল লাগল।ও জানত না যে মাসি সাইক্রিয়াটিস্ট,এরপর মাসি কয়েকবার এসেছে ওদের বাড়ী,টুবাইকে আদর করেছে,তার প্রশংসা করেছে।টুবাইও মাসিকে আবার আসতে বলে,মাসি এলে ওর খুব ভাল লাগে,মাসিও টুবাইকে বলে মাকে নিয়ে তার বাড়ী যেতে।কতদিন ক-ত-দি-ন পর টুবাই মায়ের কাছে আবদার করে মাসির বাড়ী নিয়ে যেতে।শ্রী আজ খুব খুশী ছেলের পরিবর্তনে।ওরা মাঝে মাঝেই মাসির বাড়ী যায়,টুবাই আস্তে আস্তে ফোনের নেশা ছেড়ে পড়াশুনায় ডুবে যায়,আজকাল মায়ের সাথেও সে বেশ ভালভাবে কথা বলতে শুরু করেছে।মাকে সে ফেবু বা হোয়াটসঅ্যাপ করা নিয়ে আর কিছু বলেও না ।শ্রী ভাবে,ফেবুর দৌলতেই সে এমন বন্ধু পেয়েছে,ছেলেকে নিয়ে কোনো সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে সে কোনোমতেই যেতে পারত না,তার ছেলে ক্রমশঃ শেষ হয়ে যেত।বন্ধু বলেই সে বাড়ী এসে বা টুবাইকে তার বাড়ী ডেকে সে এমন সুন্দর কাউন্সেলিং করেছে যাতে টুবাই খুব সহজেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।এতে শ্রীর যা উপকার সে করেছে তা কোনোভাবেই সম্ভব হত না এমন একজন পরোপকারী বন্ধু না থাকলে যা সে ফেবুর দৌলতেই পেয়েছে।




*****

No comments:

Post a Comment