এখন তরঙ্গ তে লেখা পাঠান প্রতিমাসের ৫ থেকে ২০ তারিখ অবধি

সতীশ বিশ্বাস




ছড়া-নাটিকা
(‘ছড়াকর্ম’)


বুদ্ধির জয়
(ঈশপের একটি ফেবল অবলম্বনে)


চরিত্রঃ সিংহ, শিয়াল, হরিণ, হাতি, চিতা, হনুমান,খরগোশ

১ম দৃশ্য
( সকালবেলা সিংহ ঘুম থেকে উঠে, সশব্দে হাই ছাড়ল।। তারপর বলে--

সিংহঃ করছে কেমন গা ম্যাজ-ম্যাজ!
লাগছে কেমন খিদে-খিদে।
ভাবনা কীসের? বনের মধ্যে
এক্ষুনি যাই ঢুকি সিধে।
যে ব্যাটাকে সামনে পাবো
মারব থাবা তারই ঘাড়ে,
আমি বনের রাজা, আমার
হাত থেকে কে বাঁচতে পারে? ( হাঁটতে হাঁটতে প্রস্থান)

২য় দৃশ্য
(দেখা যাচ্ছে-সব পশুরা প্রাণভয়ে ছুটছে। সিংহঃ তাড়া করে এসে একটা হরিণের ঘাড়ে থাবা বসায়। পরের দৃশ্যে মারে একটা শুয়োরকে। তারপরের দৃশ্যে শেয়াল। পরে হায়না।)

৩য় দৃশ্য
(পশুদের সভা বসেছে।)

শিয়ালঃ কী করা যায়, ভাবুন সবাই
উপায় একটা বের করা চাই।
রোজই দস্যু সিংহ এসে
মারছে সেটাই, যা পাচ্ছে সে।
রোজ সকালেই চার-পাঁচজন
মরতে হচ্ছে। এই কি জীবন?
বলো সব—এর নাম কি বাঁচা?
তুমিই বলো শুয়োর চাচা।

শুয়োরঃ বলার তেমন নেইতো কিছু
ভেবে দেখলাম আগু-পিছু।
একটা উপায় আছে তবে-
করতে পারলে বিহিত হবে।
আমরা যারা এ বন-গাঁয়ে
থাকি; যদি সবাই গায়ে
মাখিয়ে রাখি নোংরা, কাদা
তাহলে ওই সিংহদাদা
ঘেন্নাতেই থাকবে দূরে।
শান্তি নামবে এ বন জুড়ে।

হরিণঃ থামো! ফালতু কথা রাখো।
নিজে যেমন নোংরা থাকো
আমাদেরও রাখতে কি চাও?
সবাই আমার দিকে তাকাও।
একটি কথা বলছি জোরে,
কাল থেকেই সবাই ভোরে
চলো খেলার মাঠে জুটি।
করব সবাই ছোটাছুটি।
বাড়াতে হবে ছোটার গতি।
এ ছাড়া নেই অন্যগতি।

হাতিঃ বা; বা; হরিণ! বললে তো বেশ
কত বুদ্ধি! কী তীক্ষ্ণতা!
প্রস্তাবটা দেবার আগে
ভাবলে নাতো আমার কথা।
নিজের কথাই ভাবলে শুধু
কিন্তু মোটা আছেন যারা
শুয়োর, মহিষ, গন্ডার, মেষ,
বলতো কী করবে তারা?
তারচে’ বরং আমি বলি-
বরাবরই ঠিক বলি তো,
সবাই মিলে সিংহটাকে
করবে আগে অর্ধমৃত।
আমি তখন জড়িয়ে শুঁড়ে
শূন্যে তুলে সিংহটারে
বিশ চক্কর ঘুরিয়ে দিয়ে
ফেলব ছুঁড়ে কাঁটার ঝাড়ে।
বলবো তারে, ‘যা রাজা তুই,
গৌড় নিতাই, যা, ভজ, যা।
শেষ বিছানা হলরে তোর
আহা! মধুর কাঁটার শয্যা।
কিংবা যদি সিংহটারে
ধরো তুলে দু-চারজনে,
এক লাথিতে বাছাধনকে
পাঠিয়ে দেব বেন্দাবনে।

চিতাঃ যা বলেছ, শুনতে ভালোই,
কিন্তু করা কঠিন বড়ো।
পারো যদি যাও না একাই
রাজার সাথে লড়াই করো।
আমরা যদি আধমরাই
করতে পারি সিংহটাকে,
তোমার তবে কী দরকার আর?
আমরাই তো মারব তাকে।
তার চে’ বরং এসো সবাই
রাজার সাথে লড়াই করি,
ভীরুর মতো বাঁচার চেয়ে
বীরের মতো যুদ্ধ করি।

হনুমানঃ রাজার সঙ্গে লড়াই করা
ঠিক হবে না, বন্ধু শোন-
কারণ, আমরা পারবই না
এককাট্টা হতে কখনো।
শুধু শুধু আমরা কিছু
পশু পাখির প্রাণ হারাবো।
বরং চলো সবাই মিলে
রাজার সামনে গে’ দাঁড়াবো।
বললো তাকে যুক্তি দিয়ে
করুণ স্বরে, মিনতি ক’রে
‘দোহাই রাজা, কাল থেকে আর
মারবেন না কাউকে ধরে।
আমরা যদি রোজ সকালে
একটি পশু দিই আপনাকে,
কোথাও যেতে হবে না তবে,
ঘরে বসেই খাবেন তাকে।
রাজা এতে রাজি হলেই
বাড়তি পশু যাবে না মারা।
ভেবে দেখুন প্রস্তাবটা
ভালো লাগলে দেবেন সাড়া।

৪র্থ দৃশ্যঃ
(সিংহাসনে বসে আছেন সিংহ রাজা। সব পশুদের প্রবেশ।)

শিয়ালঃ শুভ দিবস মহারাজা।
এলাম আপনার কাছে সবাই।
অনুমতি করেন যদি,
তবে একটা আর্জি জানাই।

সিংহঃ বলো তোমরা কী বলতে চাও?
সংক্ষেপেতে আর্জি জানাও।

শিয়ালঃ
হে মহারাজ আমরা জানি,
দয়া আপনার কতখানি,
আমাদের সব প্রজার উপর
প্রজার দুঃখে হন যে কাতর।
কিন্তু বলছি হে মহারাজ,
আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন আজ।
নিয়ম মেনে ক্রমে ক্রমে
শক্তিও বেশ গেছে কমে।
শক্তি কমে, কমে না খিদে।
সব কাজ তো হয়না জিদে।
তাই বলছি হে মহারাজ,
ঘর থেকে আর বেরোবেন না
আমরা খাবার পাঠিয়ে দেব।
কাল থেকে রোজ।
তাতেই রাজা সারবেন ভোজ।

সিংহঃ হূম! যা বললে, শুনলাম সব
কিন্তু নেই তো কোন মতলব?
তুমি শেয়াল, দারুণ ধূর্ত।
প্রস্তাবে নেই অন্য সুর তো?

শেয়ালঃ না মহারাজ, বলেছি যা
সব সত্যি, নয়কো মিথ্যা।
মুখের নয়, এ কথা বক্ষের।
কুশল এতে উভয়পক্ষের।

সিংহঃ বেশ তাই হোক, হলাম রাজি।
কাল থেকে ঠিক সময়মত
পাঠিয়ে দেবে একজনকে
নইলে হবে সব নিহত। (আলো নিভে আসে।)

৫’ম দৃশ্য
(সিংহ বসে আছে। হরিণ আসতেই গর্জন করে ওঠে। তাকে মেরে খায়। পরের দৃশ্যে শুয়োর। তারপরের দৃশ্যে হায়না। পশুরা মিলে তখন খরগোসের কাছে যায়।)

শেয়ালঃ খরগোসভাই, খরগোসভাই,
বাঁচাও তুমি আর কেউ নাই
তুমি ছাড়া। বলো কীভাবে
সব পশুদের বাঁচানো যাবে।
কীভাবে এই সিংহরাজা,
শোষক, শাসক পাবে সাজা।

সিংহঃ তুমি যখন এলে, শেয়াল আমার কাছে,
অবশ্য এর মূল্য আছে। ধূর্ত তুমি,
সব চতুরের শিরোমণি।
দেখছি ভেবে ঠিক এখনই।
যাও সকলে, চিন্তা ফেলে
ভেবোনা আর।
কাল সকালে আমিই খাবার
হয়ে যাব রাজার কাছে।
হোক যা ভাগ্যে হবার আছে।
করতে হবেই একটা কিছু হেস্তনেস্ত।
সব আতঙ্ক হবে শেষতো।

৬ষ্ঠ দৃশ্য
( সিংহ অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। মাঝে মাঝে হুংকার ছাড়ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর, তাড়াতাড়ির ভান করে খরগোস প্রবেশ করে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ায়। সিংহ সারা মঞ্চ দাপিয়ে বেড়ায় আর বলে--)

সিংহঃ এই বেয়াদব, আয় এদিকে
থ্যাৎলাবো তোর মুন্ডুটিকে।
চটকাবো তোর পিন্ডি ধরে,
হাড় মাংস দু-ভাগ করে,
ফেলবো ছুঁড়ে রে বোম্বেটে,
জ্বলছে খিদের আগুন পেটে।
রাগে শরীর করছে রি-রি!
বল কেন তুই করলি দেরি?

খরগোশঃ বলছি হুজুর, ঠিক সময়ে
বেরিয়েছিলাম বাড়ির থেকে,
হঠাৎ পথে আরেক সিংহ
আগলালো পথ আমায় দেখে।
বলল হেঁকে, ‘আমিই রাজা।
এ জঙ্গলে আমিই সেরা।
আমিই আসল সিংহ এবং
ওই সিংহটা আসলে ভেড়া।

সিংহঃ কী বললি তুই-আর এক সিংহ?
সে-ই রাজা? সে-ই সেরা?
তার এতদূর আস্পর্ধা?
আমাকে কিনা বললে ভেড়া?
চল আমাকে পথ দেখিয়ে
সেই পাজিটার কাছে নে’ চল।
দেখবো আসল সিংহ কে আর
কার শরীরে কতটা বল।

খরগোশঃ আসুন, আসুন, মহারাজা,
দেবেন ওকে মহা সাজা।
হবে আজকে শত্রু-বিনাশ।
করবো সবাই শান্তিতে বাস।
(দু-জন হাঁটতে শুরু করে। মঞ্চের মধ্যেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে হাঁটে। তারপর একটা কুয়োর কাছে এসে-)

খরগোশঃ (ঝুঁকে দেখে-) ওই যে রাজা, কুয়োর ভিতর।
এমন ভীতু, এমন ইতর।
লুকিয়ে আছে তোমার ভয়ে।
লম্বা লম্বা কথা কয়ে।
এখন কেন পালাস নিজে?
টের পাবি এর শাস্তি কী যে।
স্থির হবে-কে আসল রাজা।
দিন তো হুজুর যোগ্য সাজা।

সিংহ; (কুয়োর ভিতর দেখতে দেখতে বলে-) লুকিয়েই কি পার পাবি তুই?
এবার রে তোর মরার পালা।
জ্বলছে দেহে রাগের আগুন,
তোকে মেরেই মেটাবো জ্বালা। (কুয়োর মধ্যে ঝাঁপ দিল।)

খরগোশঃ (কুয়োর ভেতর সিংহকে ছটফটাতে দেখে, নাচতেনাচতে সবাইকে ডাকে) আয়রে তোরা,আয়রে সবাই।
সিংহরাজা হলেন জবাই।

সব পশুরা পিল পিল করে ঢুকে নাচ জুড়ে দিল। সবাই একসঙ্গে বলল-
মরলো সিংহ,আর নাই ভয়।
বলো সবাই খরগোসের জয়।
বলো সবাই বুদ্ধির জয়।


সতীশ বিশ্বাস


No comments:

Post a Comment